নদীর পাড়ে গোপন মুহূর্ত

সবুজ গাছগাছালি আর আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তার গাঁ ঘেঁষে থাকা ছোট গ্রামটিতে ফিয়ার দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল একঘেয়ে কিন্তু শান্তিময় ছন্দে। ফিয়া খুব সাধারণ এক গ্রামের মেয়ে। সাদাসিধে জীবন, মিষ্টি হাসি আর চোখের মধ্যে একরাশ মায়া—এই নিয়েই তার জগৎ। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় বিলাসিতা শব্দটার সাথে তার কোনো পরিচয় নেই, আর পরিচয় হওয়ার প্রয়োজনও কখনো সে বোধ করেনি। তবে আজ সকাল থেকেই ফিয়ার মনে অন্যরকম এক আনন্দের দোলা দিচ্ছে। কারণটা আর কিছুই নয়, শহরের নামজাদা ভার্সিটিতে পড়া তার একমাত্র প্রাণের বান্ধবী রিয়ার ফোন এসেছিল গতকাল। রিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে!

ফোনটা কান থেকে নামানোর পর থেকেই ফিয়া যেন অন্য এক জগতে ভাসছে। রিয়া আর সে ছোটবেলার বন্ধু, যদিও রিয়ারা অগাধ ধনসম্পদের মালিক। শহরের অভিজাত এলাকায় বিশাল আলিশান বাড়ি তাদের, কিন্তু তাদের এই বন্ধুত্বের মাঝে সম্পদের সেই উঁচু দেয়াল কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। রিয়া তাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছে—বিয়ের অন্তত কিছুদিন আগে তাকে ওই বাড়িটিতে গিয়ে উঠতে হবে। কেনাকাটা, বিয়ের তদারকি, আড্ডা—সবকিছুর জন্যই ফিয়াকে তার লাগবেই।

মা-বাবার কাছ থেকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে অনুমতি মিলল। গ্রামের শান্ত পরিবেশ ছেড়ে একটি ছোট ট্রাভেল ব্যাগে নিজের গুটি কয়েক সাধারণ সুতির সালোয়ার-কামিজ গুছিয়ে নিয়ে ফিয়া রওনা হলো শহরের উদ্দেশ্যে। বাসের জানালায় মুখ রেখে দূরের মাঠ আর তালগাছগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে সে ভাবছিল, শহরের এই ঝকমকে জীবনটা ঠিক কেমন হবে? সেখানে কি তার মতো সাধারণ একটা মেয়ে মানিয়ে নিতে পারবে?

বাস থেকে নেমে ফিয়া যখন রিয়াদের বিশাল গেটের সামনে দাঁড়াল, তখন তার বুকটা একটু দমে গেল। এটা বাড়ি নাকি কোনো রাজপ্রাসাদ? এত বড় গেট, সামনে বিশাল বাগান, দামি দামি গাড়ির লাইন। ইতস্তত করে সিকিউরিটি গার্ডকে রিয়ার নাম বলতেই তারা সম্মান দেখিয়ে তাকে ভেতরে নিয়ে গেল। রিয়া যেন দরজায় অপেক্ষা করছিল। ফিয়াকে দেখেই ও দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।

"ফিয়া! তুই অবশেষে আসলি! তোকে ছাড়া আমার বিয়ের কোনো প্রিপারেশনই অসম্পূর্ণ থেকে যেত রে," একশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেলল রিয়া।

ফিয়া হেসে বলল, "তোর বিয়ে আর আমি আসব না, তা কি হয়? কিন্তু তোর বাড়িটা তো পুরো রাজপ্রাসাদ! আমার তো ভয়ই করছে ভেতরে ঢুকতে।"

"ধুর পাগলী! এটা তোর নিজের বাড়ি মনে করবি," রিয়া তাকে টেনে ভেতরে নিয়ে গেল।

বিশাল ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই ফিয়ার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ঝাড়বাতির আলো, দামি সোফা সেট, চারপাশের আভিজাত্যের ছোঁয়া। গ্রামের মাটির সোঁদা গন্ধের সাথে শহরের এই এয়ারকন্ডিশন ঠান্ডা ভাবটার কোনো মিল নেই। রিয়া তাকে ৩ তলায় একটা বিশাল গেস্ট রুমে নিয়ে গেল। ঘরটা এতটাই বড় যে ফিয়ার গ্রামের আস্ত বাড়িটাও বোধহয় এর সমান হবে।

ফ্রেশ হয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফিয়া যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছিল, ঠিক তখনই নিচের উঠোনে আর ড্রয়িংরুমে একটা শোরগোল শোনা গেল। গাড়ির হর্নের শব্দ, সাথে কাজের লোকদের দৌড়াদৌড়ি।

রিয়া হাসিমুখে ঘরে ঢুকে বলল, "ফিয়া, চল নিচে চল! আমার বড় ভাইয়া বিদেশ থেকে ফিরেছে। ইউকে থেকে সোজা ল্যান্ড করল মাত্র। তোকে ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।"

ফিয়া একটু দ্বিধায় পড়ল। রিয়ার বড় ভাই? সে তো কখনো তাকে দেখেনি। রিয়া তাকে প্রায় জোর করেই নিচে নিয়ে এলো। ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে ছিল দীর্ঘদেহী এক যুবক। পরনে জিন্স আর কালো শার্ট, হাতে দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি, আর চোখে রোদচশমা ঝুলানো। চুলগুলো একটু উস্কোখুস্কো হলেও তার অবয়বে এক অদ্ভুত অহংকার আর ব্যক্তিত্বের ছাপ। চেহারাটা একদম পারফেক্ট, যেন কোনো ছবির নায়ক। সেই ঈশান—রিয়ার একমাত্র বড় ভাই। ইউকেতে নিজের বিজনেস সামলায়, আর দেখতে যেমন সুপুরুষ, স্বভাবটাও ঠিক তেমনই উদ্ধত ও চঞ্চল।

ঈশান ঘরে ঢুকতেই ঘরের পরিবেশটা যেন বদলে গেল। বাড়ির সবাই তাকে ঘিরে ধরেছে। রিয়া দৌড়ে গিয়ে ভাইয়ের গায়ে ঢলে পড়ল, "ভাইয়া! তুই ফাইনালি আসলি! আমি ভাবছিলাম তুই বুঝি আমার বিয়েতে আসতে পারবি না।"

ঈশান রিয়ার গালে একটা টোকা মেরে বলল, "তোর বিয়ে আর তোর এই গুণধর ভাই থাকবে না, তা কি হয় রে ছোটু? পুরো উড়ে চলে এসেছি।"

কথা বলতে বলতেই ঈশানের চোখ গিয়ে পড়ল রিয়ার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার ওপর। অতি সাধারণ সুতির একটা নীল কামিজ পরা, লম্বাসুন্দরি, একদম তেলহীন সাধারণ ভাবে বাঁধা চুল, কিন্তু মুখটা যেন জোছনার মতো উজ্জ্বল। কোনো মেকআপ নেই, কিন্তু তার ওই ডাগর ডাগর চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত নিষ্পাপ ভাব আছে। ঈশানের চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। শহরের রূপসী আর গ্ল্যামারাস মেয়েদের দেখে অভ্যস্ত ঈশানের কাছে ফিয়াকে একদম অন্য গ্রহের কেউ বলে মনে হলো।

রিয়া খেয়াল করল ঈশানের দৃষ্টি। সে ফিয়ার হাত ধরে টেনে সামনে এনে বলল, "ভাইয়া, ও হলো ফিয়া। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, গ্রামের সেই ফিয়া! তোকে বলেছিলাম না ওর কথা?"

ঈশান নিজের চোখের চশমাটা একহাতে খুলে শার্টের কলারের সাথে ঝুলাল। তারপর ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটিয়ে তুলল। ফিয়ার দিকে দু-পা এগিয়ে এসে ফিয়াকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত পরখ করল।

ঈশানের এই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফিয়া মারাত্মক অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। সে মাথা নিচু করে রইল, চোখের পাতা জোড়া ভয়ে আর লজ্জায় কাঁপছিল।

ঈশান বেশ গম্ভীর গলায় কিন্তু কণ্ঠে চরম দুষ্টুমি মিশিয়ে বলল, "ওহ! তাহলে ইনিই সেই বিখ্যাত গ্রাম্য বালিকা ফিয়া? তা রিয়া, তোর বান্ধবীর কি ভাষা ফুটেনি? নাকি শহরে এসে রাজপ্রাসাদ দেখে একদম বোবা হয়ে গেছে?"

ঈশানের এই সরাসরি কথায় ফিয়া চমকে উঠে চোখ তুলল। রক্তবর্ণ হয়ে উঠল তার ফর্সা গাল দুটো। কতটা অভদ্র এই লোকটা! প্রথম দেখাতেই এভাবে খোঁচা দিয়ে কথা বলল?

ফিয়া নিজের রাগ সংবরণ করে নিচু কণ্ঠে বলল, "না, আমি বোবা নই। আর আপনার এই প্রাসাদ দেখে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই।"

ঈশান ফিয়ার দিকে আরেকটু ঝুঁকলো। মৃদু এক সুবাস এসে ফিয়ার নাকে লাগল—দামি পারফিউমের গন্ধ। ঈশান নিচু স্বরে বলল, "তাই নাকি? কিন্তু তোমার এই কাঁপতে থাকা হাত দুটো তো অন্য কথা বলছে, মিস ফিয়া। দেখা যাক, কতদিন এই অহংকার ধরে রাখতে পারো।"

ঈশানের সেই দুষ্টু হাসি আর আত্মবিশ্বাসী কথাগুলো ফিয়ার বুকের ভেতরে অচেনা এক ঝড়ের সৃষ্টি করল।

প্রথম দিনের সেই অনভিপ্রেত সাক্ষাতের পর ফিয়া চেষ্টা করছিল ঈশানের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার। কিন্তু বিশাল এই প্রাসাদতুল্য বাড়িতে সেটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঈশান যেন ফিয়াকে উত্যক্ত করার একটাও সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। সে যেন প পণ করে বসেছে—গ্রামের এই শান্ত, লাজুক মেয়েটির মুখের সরল ভাবটা সে নিজের দুষ্টুমি দিয়ে কেড়ে নেবে।

পরদিন সকালে ফিয়া যখন রিয়ার সাথে রান্নাঘরে গিয়ে ভাবছিল সকালের নাশতায় সাহায্য করবে, ঠিক তখনই ঈশান সেখানে এসে হাজির। ব্ল্যাক কফি হাতে নিয়ে সে রান্নাঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ট্রাউজার আর সাধারণ একটা টি-শার্টেও তাকে মারাত্মক সুপুরুষ লাগছিল।

ফিয়া ট্রের ওপর কাপগুলো সাজাচ্ছিল। ঈশান চুপচাপ হেঁটে এসে ফিয়ার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। ফিয়া টের পেল তার পিঠের পেছনে একটা উষ্ণ উপস্থিতি। ঈশানের পারফিউমের গাঢ় সুবাস আবার তার নিঃশ্বাসে মিশে গেল।

"গ্রামের মেয়েরা কি এত দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে, মিস ফিয়া?" ঈশানের চর্বিত কণ্ঠ ভেসে এলো ফিয়ার কানের খুব কাছ থেকে।

ফিয়া চমকে উঠে পেছনে ফিরতেই ঈশানের বুকের সাথে প্রায় ধাক্কা খাওয়ার জোগাড়। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে দেওয়ালের সাথে সেঁটে গেল। হৃদস্পন্দন যেন একলাফে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ঈশান সরেনি, বরং নিজের এক হাত ফিয়ার মাথার পাশে দেওয়ালে রেখে তাকে একপ্রকার বন্দি করে ফেলল।

"আমি অনেক সকালেই উঠেছি," ফিয়া চোখ নামিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, "আর... আর এভাবে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? সরুন, রিয়া আসবে এখন।"

ঈশান বাঁকা হেসে তার আরও একটু কাছে ঝুঁকল। ফিয়ার কপালের ওপর নেমে আসা একটা চুল হালকা আঙুলে সরিয়ে দিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিল। ঈশানের আঙুলের ছোঁয়ায় ফিয়ার পুরো শরীরে একটা বিদ্যুতের ঝলক খেলে গেল। অহেতুক এক অনুভূতিতে তার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এলো।

"রিয়া এখন ওর বিয়ের শপিং নিয়ে ব্যস্ত," ঈশান ফিয়ার গালে নিজের গরম নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "আর আমি দেখতে চাইছিলাম, গ্রামের এই অভিমানী মেয়েটা রাগলে ঠিক কতটা সুন্দর লাগে।"

"আপনি চরম অভদ্র!" ফিয়া ঈশানের বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে ঈশানের হালকা হাসির শব্দ ফিয়ার কান পর্যন্ত পৌঁছে গেল।

বিকেলে রিয়া, ফিয়া আর ঈশান একসাথে শপিং মলে গেল বিয়ের কেনাকাটার জন্য। শহরের এতো বড় শপিং মল ফিয়া জীবনে প্রথম দেখল। কাচের দেওয়াল, ঝলমলে আলো আর ব্র্যান্ডেড সব দোকান। রিয়া নিজের পোশাক দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেই ঈশান ফিয়াকে একটা জমকালো শাড়ির দোকানের দিকে টেনে নিয়ে গেল।

"এটা তোমার জন্য," ঈশান একটা গাঢ় লাল রঙের জামদানি শাড়ি ফিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল।

ফিয়া অবাক হয়ে তাকাল, "আমি এটা নেব কেন? আর আমি এসব দামি শাড়ি পরি না।"

"কেন? গ্রামের মেয়েরা বুঝি লাল শাড়ি পরতে পারে না?" ঈশানের গলায় হালকা খোঁচা, কিন্তু চোখে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা। সে ফিয়ার দিকে চেপে এসে নিচু স্বরে বলল, "আমার বিয়ের প্রথম অনুষ্ঠানে তোমাকে আমি এই শাড়িতে দেখতে চাই। না পরলে... তুলে নিয়ে গিয়ে নিজে পরিয়ে দেব, মনে থাকে যেন।"

ঈশানের হুমকিটা যে সে রসিকতা করে বলেনি, তার চোখের চাহনিতেই তা স্পষ্ট। ফিয়া রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে শাড়িটা হাতে নিল।

কেনাকাটা শেষে গাড়িতে ফেরার পথে ফিয়া পেছনের সিটে রিয়ার পাশে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। আয়নায় চোখ পড়তেই সে দেখল, ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা ঈশান বারবার লুকিং গ্লাসে ফিয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে। ফিয়া চোখ সরাতেই ঈশান আয়নায় তাকে দেখে একটা দুষ্টু টিপ মারল। ফিয়ার বুকটা ধুকপুক করে উঠল। কেন লোকটা তাকে এভাবে পাগল করে দিচ্ছে? কেন এই উত্যক্ত করার পেছনেও এক ধরনের অনাবিষ্কৃত মায়া লুকিয়ে আছে?

রাতে সবাই নিজ নিজ ঘরে চলে যাওয়ার পর ফিয়া বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছিল। সে ভাবছিল ঈশানের কথা। লোকটা যেমন জেদি, তেমনই চঞ্চল। কিন্তু তার এই দুষ্টুমির ভেতরে কোথাও যেন এক অদ্ভুত টান আছে, যা ফিয়াকে ভেতরে ভেতরে নাড়া দিচ্ছে।

"এত রাতে বেলকনিতে একা দাঁড়িয়ে কার কথা ভাবা হচ্ছে? আমার?"

হঠাৎ পাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠে ফিয়া চমকে উঠল। পাশে তাকাতেই দেখল পাশের বেলকনি থেকে ঈশান দেওয়াল টপকে সোজা ফিয়ার বেলকনিতে এসে দাঁড়াল!

"আপনি... আপনি এখানে কীভাবে এলেন? পড়ে গেলে তো মারা যেতেন!" ফিয়া ভয়ে চিৎকার করে উঠতে গিয়েও সামলে নিল।

"তোমার ভালোবাসায় পড়ার চেয়ে দেওয়াল থেকে পড়ে যাওয়া অনেক সহজ, ফিয়া," ঈশান এক পা এগিয়ে এলো।

চাঁদের আলোয় ঈশানের মুখটা যেন আরও মোহময় লাগছিল। ঈশান ফিয়ার একদম কাছে এসে তার দুটো হাত নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। ফিয়া ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ঈশানের শক্তির কাছে পারল না।

"আমাকে জ্বালিয়ে আপনার কী লাভ বলুন তো?" ফিয়া চোখ ছলছল করে জানতে চাইল।

ঈশান ফিয়ার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। অতি আলতো, এক গভীর ভালোবাসার স্পর্শ। ফিয়া স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে গেছে।

ঈশান ফিয়ার চোখে চোখ রেখে বলল, "তোমাকে জ্বালানো আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে, ফিয়া। কারণ তুমি যখন রাগ করো, তোমার এই চোখ দুটো আমার দিকে যেভাবে তাকায়, তা আমাকে পাগল করে দেয়।"

ফিয়া কিছু বলতে পারল না। ঈশানের এই হঠাৎ রূপ, এই নিবিড় টান তার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার করে দিল। সে কেবল ঈশানের বুকের ধুকপুকানি শুনতে পেল, যা স্পষ্ট বলছিল—এই খেলা আর কেবল দুষ্টুমিতে সীমাবদ্ধ নেই, তা ধীরে ধীরে গভীর এক অনুরাগে পরিণত হচ্ছে।

ঈশানের কপালে ছোঁয়ানো সেই নরম স্পর্শটা ফিয়ার সারা রাতের ঘুম কুরে কুরে খেল। সে যতবারই চোখ বন্ধ করতে চাইল, ততবারই ঈশানের সেই গভীর চোখ আর শান্ত কণ্ঠস্বর তার মনে দোলা দিয়ে গেল। গ্রামের এক অচেনা, সাদাসিধে মেয়ে সে—হৃদয়ের এত গভীর অনুভূতি সামলানোর শক্তি তার ছিল না। কিন্তু একই সাথে মনের এক কোণে চরম ভয় তাকে গ্রাস করছিল। কোথায় ঈশান—এক বিশাল ধনকুবেরের একমাত্র উত্তরাধিকারী, রাজপুত্রের মতো তার জীবন; আর কোথায় সে—এক সামান্য গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে! এই দুই জগতের মাঝে মিলন কীভাবে সম্ভব?

পরদিন সকাল থেকেই বাড়িতে বিয়ের ধুমধাম আরও বেড়ে গেল। মেহমানদের আনাগোনা, উপহারের ডাল সাজানো আর আলোকসজ্জার কাজ চলছে পুরোদমে। ফিয়া ব্যস্ত ছিল কাজের লোকদের তদারকি নিয়ে। সে ঈশানকে এড়িয়ে চলার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু ঈশান যেন ছায়ার মতো তার পেছনে লেগে রইল।

দুপুরের দিকে ফিয়া যখন রিয়ার ঘরের জন্য নতুন ফুলদানি সাজাচ্ছিল, ঈশান নিরবে ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা আটকে দিল।

দরজা বন্ধের শব্দে ফিয়া পেছনে ফিরে চমকে উঠল। "আপনি দরজা আটকালেন কেন? কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?"

ঈশান কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। ফিয়ার হাতের ফুলগুলো টেবিলের ওপর সরিয়ে রেখে সে ফিয়ার দুটি কাঁধ শক্ত করে ধরে তাকে নিজের দিকে ঘোরাল। ঈশানের চোখে আজ কোনো চঞ্চলতা বা দুষ্টুমি ছিল না, সেখানে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা আর ব্যাকুলতা।

"তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছ কেন, ফিয়া?" ঈশানের গলাটা খানিকটা গম্ভীর শোনাল।

"আমি... আমি কাউকে এড়িয়ে চলছি না। রিয়ার বিয়ের অনেক কাজ," ফিয়া চোখ নামিয়ে উত্তর দিল।

"মিথ্যা বোলো না," ঈশান ফিয়ার থুতনি ধরে মুখটা ওপরে তুলল। "গতকালের পর থেকে তুমি আমার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছও না। কেন? ভয় পাচ্ছ আমাকে, নাকি নিজের অনুভূতিকে?"

ফিয়ার চোখে জল জমে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল, "আমাদের মাঝে কোনো অনুভূতি থাকাটাই যে ভুল, ঈশান সাহেব। আপনি শহরের এত বড় ঘরের ছেলে, আর আমি একটা সামান্য গ্রামের মেয়ে। আমাদের কোনো মিল নেই। দয়া করে আমাকে এভাবে উত্যক্ত করবেন না।"

ঈশানের মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। সে ফিয়ার গালের কাছে মুখ এনে ভীষণ মায়া জড়ানো কণ্ঠে বলল, "ভালবাসা কখনো ধনী-গরিবের হিসাব মিলিয়ে আসে না, ফিয়া। আমি তোমাকে প্রথম যেদিন দেখেছি, সেদিন থেকেই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তোমার এই নিষ্পাপ চোখ, এই অহংকারহীন মন—সবকিছু আমাকে বদলে দিয়েছে। আমি তোমাকে চাই, কেবল আমার করে।"

ঈশানের এই সরাসরি ভালোবাসার স্বীকারোক্তিতে ফিয়ার বুকটা ধুকপুক করে উঠল। যে কথাটা শোনবার জন্য ফিয়ার মন গোপনে ব্যাকুল ছিল, তা শুনে তার চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ঈশান আলতো করে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সেই জল মুছে দিয়ে ফিয়ার কপালে আবার নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। ফিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ঈশানের বুকে নিজের মাথাটা গুঁজে দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ঈশান দু-হাত দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইল।

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় সজোরে ধাক্কা পড়ল।

"ঈশান! ফিয়া! ভেতরে কে আছো?"

কণ্ঠটা শুনে ঈশান আর ফিয়া দুজনেই থমকে গেল। ওটা ঈশানের বাবা, অর্থাৎ এই বিশাল প্রাসাদের মালিক রোমান চৌধুরীর কণ্ঠ। ফিয়া ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ঈশান ফিয়ার হাত ধরে আশ্বস্ত করে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল।

বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন গম্ভীর চেহারার রোমান চৌধুরী। তার চোখে ছিল চরম রাগ আর ঘৃণা। তিনি কিছুক্ষণ ঈশান আর ভেতর দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকা ফিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ঈশানের দিকে ফিরে কঠিন গলায় বললেন, "ঈশান, তুমি আমার স্টাডি রুমে এসো। এখনই।"

ঈশান শান্ত গলায় বলল, "বাবা, আমি ফিয়াকে ভালোবাসি। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।"

ঈশানের মুখ থেকে কথাটা শোনামাত্র যেন ঘরে বাজ পড়ল। রোমান চৌধুরীর মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। "তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি! ইউকে থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসে তুমি এই সামান্য এক গ্রাম্য ভিখারি মেয়েকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখছ? ও আমাদের এই বংশের যোগ্য নয়!"

কথাগুলো ফিয়ার কানে বিষের মতো বিধল। তার বুকের ভেতরটা যেন দু-টুকরো হয়ে গেল। 'ভিখারি মেয়ে!'—এই একটা শব্দে তার সমস্ত আত্মসম্মান ধুলোয় মিশে গেল।

ঈশান চটে উঠে বলল, "বাবা! মুখ সামলে কথা বলুন! ফিয়া আমার পছন্দ, আর ওর যোগ্যতার বিচার আপনি করার কে?"

"চুপ করো!" রোমান চৌধুরী গর্জে উঠলেন। "যে মেয়ে আমার মেয়ের বান্ধবী হিসেবে এসে আমার ছেলেকে নিজের মায়াজালে ফাঁদে ফেলেছে, তাকে আমি এক মুহূর্তও এই বাড়িতে সহ্য করব না।"

তিনি ফিয়ার দিকে তাকিয়ে বিশ্রী এক বাঁকা হাসি হেসে বললেন, "তোমাদের মতো ছোটলোকের মেয়েদের আমরা চিনি। ধনসম্পদের লোভে বড়লোকের ছেলেদের মাথা খাওয়া তোমাদের স্বভাব। কত টাকা চাও তুমি? টাকা নিয়ে আমার ছেলের জীবন থেকে দূর হয়ে যাও!"

ফিয়ার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো। তার সরল আত্মসম্মানে এর চেয়ে বড় আঘাত আর হতে পারত না। সে কোনো কথা বলতে পারল না, কেবল ডুকরে কেঁদে উঠল।

ঈশান তার বাবাকে থামাতে চাইল, কিন্তু ফিয়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। নিজের সমস্ত বুকভাঙা কষ্ট আর অপমান বুকে চেপে সে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল। ঈশান পেছন থেকে "ফিয়া! ফিয়া!" করে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু রোমান চৌধুরী গার্ড ডেকে ঈশানকে আটকে রাখলেন।

ঘরের দরজা বন্ধ করে ফিয়া হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার ভালোবাসার এই পরিণতি? শহরের আলো তাকে সত্যি অন্ধ করে দিয়েছিল। রিয়াকে কিছু না জানিয়ে, নিজের সামান্য পোশাক-আশাকগুলো ব্যাগে ভরে নিয়ে ফিয়া পেছনের দরজা দিয়ে সেই আলিশান প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এলো।

রাস্তার তীব্র আলো আর ভিড়ের মাঝে একলা হাঁটতে হাঁটতে ফিয়ার চোখের জল থামছিল না।

গ্রামে ফিরে আসার পর থেকে ফিয়ার দিনগুলো যেন থমকে গিয়েছিল। ঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে থাকা আর অঝোরে চোখের জল ফেলা—এই ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। মা-বাবা মেয়ের মুখ দেখে বুঝতে পেরেছিলেন বড় কোনো আঘাত সে পেয়েছে, কিন্তু ফিয়া মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলেনি। রিয়ার বিয়েতে না থেকে এভাবে হুট করে চলে আসার কারণ হিসেবে কেবল শরীর খারাপের অজুহাত দিয়েছিল। কিন্তু তার মনের ভেতর যে তীব্র ভাঙন ধরেছিল, তা ঢেকে রাখার সাধ্য তার ছিল না।

শহরের সেই ঝলমলে দিনগুলো, ঈশানের দুষ্টুমিভরা দৃষ্টি, কপালে সেই আলতো স্পর্শ আর শেষে তার বাবার মুখ থেকে আসা বিষাক্ত অপমানের শব্দগুলো—সবকিছু ফিয়ার ভেতরে প্রতিনিয়ত তোলপাড় সৃষ্টি করছিল। ফিয়া ভেবেছিল, গ্রামে ফিরে এলে সে হয়তো ঈশানকে ভুলে যেতে পারবে। কিন্তু ভালোবাসার শিকড় যে এত গভীরে গিয়ে বিঁধেছে, তা সে আগে অনুধাবন করতে পারেনি।

এক সপ্তাহ কেটে গেছে। বিকেলের সূর্যটা তখন হেলে পড়েছে গাঁয়ের বাঁশঝাড়ের পেছনে। গ্রামের কাঁচা রাস্তার ওপর ধূলো উড়িয়ে এক মৃদু হাওয়া বইছিল। ফিয়া পুকুরপাড়ে একটা বড় গাছের ছায়ায় বসে জলের ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।

ঠিক তখনই গ্রামের মেঠো পথে একটা বিকট শব্দে গাড়ি থামার আওয়াজ পাওয়া গেল। এত বড় আর দামি গাড়ি এই প্রত্যন্ত গ্রামে সচরাচর আসে না। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা উৎসুক হয়ে গাড়িটার পেছনে দৌড়াতে লাগল। ফিয়া উদাস মনে সেদিকে তাকাল।

গাড়ির দরজা খুলে যে পুরুষটি বের হয়ে এলো, তাকে দেখে ফিয়ার বুকের ধুকপুকানি মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। চোখে সানগ্লাস, পরনে সাতাশ হাত ধূলো মাখা ক্যাজুয়াল শার্ট আর জিন্স—স্বয়ং ঈশান দাঁড়িয়ে আছে তাদের মাটির রাস্তার ওপর! দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসার ক্লান্তিতে তার চেহারায় ছাপ পড়েছে, চুলগুলো উস্কোখুস্কো, কিন্তু তার চোখে সেই একই অদম্য জেদ আর ভালোবাসা।

ফিয়া নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ঈশান এখানে? কীভাবে সম্ভব? সে তো ভেবেছিল শহরের সেই রাজপুত্র হয়তো এতদিনে তাকে ভুলে নিজের বিলাসবহুল জীবনে ফিরে গেছে।

ঈশান একনজর চারপাশটা দেখে নিয়েই দূর থেকে ফিয়াকে দেখতে পেল। ফিয়া জলদি উঠে দাঁড়িয়ে উল্টোদিকে হাঁটা দিতেই ঈশান দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে তার পথ আটকে দাঁড়াল।

"কোথায় পালানোর চেষ্টা করছ, ফিয়া?" ঈশানের হাঁপাতে থাকা কণ্ঠ ভেসে এলো।

ফিয়া চোখ সরিয়ে কঠিন গলায় বলল, "আপনি এখানে কেন এসেছেন? দয়া করে চলে যান। আমার গ্রামে এসে নতুন করে আমাকে অপমানিত করবেন না।"

ঈশান একহাতে ফিয়ার ককনকনে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হাতটা সজোরে ধরে ফেলল। "অপমান? তুমি ভেবেছ আমার বাবার বলা ওই ফালতু কথাগুলোর জন্য আমি তোমাকে ছেড়ে দেব? ফিয়া, তুমি আমাকে এতই দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবলে?"

"ছেড়ে দিন আমার হাত!" ফিয়া হাত ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে বলল, "আপনার বাবা ঠিকই বলেছেন। আমরা সাধারণ গ্রামের মানুষ, আপনাদের আভিজাত্যের সাথে আমাদের কোনো তুলনা হয় না। দয়া করে আমাকে নিজের মতো বাঁচতে দিন।"

ঈশান ফিয়ার দিকে একপা এগিয়ে এসে তার দুটি গালে নিজের হাত দুটো রাখল। ফিয়ার চোখ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে ঈশানের হাতের ওপর পড়ল।

"আমি কোনো আভিজাত্য বুঝি না, ফিয়া," ঈশান খুব নিচু কিন্তু গভীর স্বরে বলল। "আমি শুধু তোকে বুঝি। তুই যেদিন না বলে চলে এসেছিস, সেদিন আমার মনে হয়েছে আমার বুকের ভেতরটা শূন্য হয়ে গেছে। ইউকে থেকে আমি ধনসম্পদ কুড়াতে আসিনি, আমি তোকে ভালোবাসতে এসেছি। বাবা যা বলেছে তার জন্য আমি ক্ষমা চাইছি, কিন্তু তোকে ছাড়া ফিরে যাওয়ার কোনো পথ আমার জানা নেই।"

ঈশানের এই আকুলতা আর সত্যতা ফিয়ার ভেতরে গড়ে তোলা রাগের পাহাড় মুহূর্তেই গলিয়ে দিল। ফিয়া মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

ঈশান আলতো করে ফিয়ার কপালটা নিজের কপালের সাথে ঠেকাল। গ্রামের এই নীরব প্রকৃতির মাঝে, মেঠো পথের ধারে দুজন মানুষের নিঃশ্বাস এক হয়ে গেল। ঈশান নিচু স্বরে বলল, "আমি এই গ্রামেই থাকব। তোমার চোখের সামনে, তোমার আশেপাশে। যতক্ষণ না তুমি নিজ মুখে আমাকে গ্রহণ করছ, আমি একচুলও এখান থেকে নড়ব না।"

ঈশানের জেদের কাছে ফিয়াকে অবশেষে হার মানতেই হলো। শহরের বিলাসবহুল জীবন, এয়ারকন্ডিশন রুম আর দামি গাড়ির মায়া ত্যাগ করে ঈশান সত্যি সত্যি থেকে গেল এই প্রত্যন্ত গ্রামে। ফিয়াদের মাটির বাড়ির ছোট্ট একটা ঘরে তার থাকার ব্যবস্থা হলো। গ্রামের সাধারণ খাবার, মশার উপদ্রব আর গরম—কোনো কিছুই ঈশানকে একবিন্দুও বিচলিত করতে পারল না। তার চোখে তখন কেবল ফিয়াকে পাওয়ার গভীর উন্মাদনা।

পরদিন ভোরে ফিয়া যখন কলপাড়ে জল ভরতে গেল, তখন পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে। সুবাতাসে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর পাখির কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত। ফিয়া নদীর পার ঘেঁষে থাকা বড় আমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে নিজের ভিজা চুলগুলো নিঙড়াচ্ছিল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে দুটো শক্ত হাত এসে ফিয়ার কোমর পেঁচিয়ে ধরল।

ফিয়া আঁতকে উঠে চিল চিৎকার দিতে যাবে, অমনি ঈশান একহাতে ফিয়ার মুখ চেপে ধরে তাকে সোজা আমগাছটার গুঁড়ির সাথে সেঁটে দিল। ফিয়ার ভেজা সুতির শাড়ির স্পর্শে ঈশানের বুকের শার্টটা নিমেষেই ভিজে উঠল।

"চুপ! একদম চিৎকার করবে না," ঈশানের ঘণ নিঃশ্বাস ফিয়ার কানের লতিতে গিয়ে আছড়ে পড়ল।

ফিয়া চোখ বড় বড় করে তাকাল। ঈশানের চুলগুলো ভেজা, কপালে কয়েকটা জলের ফোঁটা চকচক করছে। তার চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত কামনাময় ভালোবাসা আর গভীর প্রেম ফুট উঠছে।

ঈশান ফিয়ার মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিল, কিন্তু তাকে একচুলও নড়ার সুযোগ দিল না। নিজের শরীরটাকে ফিয়ার সাখে গাঢ়ভাবে চেপে ধরে সে ফিয়ার ভেজা গাল আর গলার দিকে তাকাল। ফিয়ার পুরো শরীর ঈশানের এই তীব্র সান্নিধ্যে কাঁপতে শুরু করেছে।

"ঈ... ঈশান, ছেড়ে দিন," ফিয়ার কণ্ঠ ভয়ে আর অহেতুক আবেশে জড়িয়ে এলো। "গ্রামের কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে!"

ঈশান একহাতে ফিয়ার থুতনিটা ওপরে তুলে ধরে তার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এলো। "দেখুক সবাই। আজ আর আমি কাউকে ভয় পাই না, ফিয়া। তোমাকে না পেয়ে আমি ছটফট করেছি এতগুলো দিন। তুমি জানো না, প্রতিদিন রাতে তোমাকে কাছে পাওয়ার তৃষ্ণা আমাকে কতটা পুড়িয়েছে।"

ঈশান আর ফিয়াকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। সে ফিয়ার নরম, রসালো ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের বন্ধনে শক্ত করে বন্দি করে নিল।

ফিয়ার পুরো মাথায় যেন বাজ পড়ল। তার হৃদস্পন্দন থমকে গেল, চোখ দুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এলো। ঈশানের চাওয়াটা ছিল চরম গভীর, তীব্র আর ভালোবাসায় ভরপুর। সে যেন ফিয়ার সমস্ত অভিমান আর দূরত্ব এক নিমিষেই চুষে নিতে চায়। ঈশানের এক হাত ফিয়ার পিঠের ওপর চেপে বসে তাকে আরও গভীরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল, অন্য হাত দিয়ে সে ফিয়ার ভিজে যাওয়া চুলগুলো খামচে ধরল।

ফিয়া প্রথমে কিছুটা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, ঈশানের এই বাঁধভাঙা সোহাগের কাছে সে নিজের সমস্ত প্রতিরোধ হারিয়ে ফেলল। ফিয়ার দুটো হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে এসে ঈশানের গলা পেঁচিয়ে ধরল। নদীর পাড়ের নির্জনতায়, মিষ্টি রোদের আলোয় দুটি প্রাণ একাকার হয়ে গেল এক গভীর, মাতাল করা অনুরাগে।

কয়েক মিনিট পর ঈশান যখন আলতো করে ফিয়ার ঠোঁট ছেড়ে দিল, ফিয়া তখন ঈশানের বুকে মাথা রেখে হাঁপাচ্ছে। ফিয়ার ঠোঁট দুটো কামড়ে লাল হয়ে গেছে, গালে গোলাপি আভা। ঈশান ফিয়ার কপালে আর চোখের পাতায় ঘন ঘন মিষ্টি চুমু এঁকে দিল।

"এখনও বলবে আমি তোমাকে ভালোবাসি না, মিস ফিয়া?" ঈশান নিচু স্বরে, এক পরম তৃপ্তির হাসি হেসে ফিয়ার কানে ফিসফিস করল।

ফিয়া লজ্জায় ঈশানের বুকের মধ্যে মুখ লুকাল। সে বুঝতে পারল, এই ভালোবাসার গভীরতা মাপার সাধ্য তার নেই। ঈশান তার সমস্ত ভয়, সামাজিক বাধা আর আত্মসংকোচ এক চুমুতেই মুছে দিয়েছে।

নদীর পাড়ের সেই মধুময় মুহূর্তটির পর ফিয়া আর ঈশানের সম্পর্ক এক নতুন রূপ নিল। ফিয়া এখন আর নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে না। গ্রামের মেঠো পথ, ধানক্ষেতের আইল আর বটতলার ছায়ায় দুজন পাশাপাশি হেঁটে চলে। ঈশানের চঞ্চলতা আর দুষ্টুমিগুলো ফিয়ার কাছে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় অনুভূতির মতো লাগে। কিন্তু এই সুখের দিনগুলো যে খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে না, তা তাদের জানা ছিল না।

দিন চারেক পর, দুপুরবেলা যখন সমস্ত গ্রাম নিঝুম হয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই ফিয়াদের ছোট্ট মাটির ঘরের সামনে এসে থামল দুটি কালো রঙের বিলাসবহুল দামি গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে এলেন স্বয়ং রোমান চৌধুরী। সাথে বেশ কয়েকজন হৃষ্টপুষ্ট বডিগার্ড।

রোমান চৌধুরীর হঠাৎ আগমনে গ্রামের মানুষের মধ্যে চঞ্চলতা ছড়িয়ে পড়ল। ফিয়ার বাবা-মা ভয়ে আর ইতস্তত করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ঈশান আর ফিয়া তখন পেছনের বারান্দায় বসে গল্প করছিল। সামনে শোরগোল শুনে দুজনেই এগিয়ে এলো।

বাবাকে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঈশানের চোখ দুটো কঠোর হয়ে উঠল। সে ফিয়াকে নিজের পেছনে আড়াল করে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, "তুমি এখানে কেন এসেছ, বাবা?"

রোমান চৌধুরী চরম ঘৃণা আর তাচ্ছিল্যের সাথে চারপাশের মাটির ঘরবাড়ি আর ফিয়ার বাবা-মায়ের দিকে তাকালেন। তারপর ঈশানের দিকে ফিরে গর্জে উঠলেন, "তোমার এই নাটক অনেক হয়েছে, ঈশান! এই নোংরা গ্রামে, এক সামান্য ভিখারি মেয়ের জন্য তুমি চৌধুরী বংশের নাম ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছ? তোমার কি একটুও লজ্জা করছে না?"

ফিয়ার বাবা হাতজোড় করে এগিয়ে এলেন, "সাহেব, আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু ভিখারি নই। আপনার ছেলে নিজ ইচ্ছায় এখানে এসেছে, আমরা ওকে জোর করে ধরে রাখিনি।"

"চুপ করো!" রোমান চৌধুরী হাত উঁচিয়ে ফিয়ার বাবাকে থামিয়ে দিলেন। "তোমাদের মতো ছোটলোকদের চালাকি আমার ভালোই জানা আছে। মেয়েকে দিয়ে আমার ছেলেকে ফাঁসিয়েছ, যাতে সারাজীবন আমাদের টাকায় বসে খেতে পারো!"

কথাগুলো শোনামাত্র ঈশান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সজোরে সামনে এসে চিৎকার করে উঠল, "বাবা! একদম সীমা অতিক্রম করবে না! ফিয়া আমার ভালোবাসা, আর ওর পরিবারকে অপমান করার কোনো অধিকার তোমার নেই।"

রোমান চৌধুরী একটা কুৎসিত বাঁকা হাসি হাসলেন। তিনি নিজের পকেট থেকে একটা চেকবই বের করে তাতে স্বাক্ষর করলেন। তারপর ফিয়ার দিকে চেকটা ছুড়ে মেরে বললেন, "তোমার এই ভালোবাসার দাম কত, মেয়ে? এক কোটি? দুই কোটি? এই নাও এক কোটি টাকার চেক। আমার ছেলের জীবন থেকে চিরতরে মুছে যাও। আর যদি না যাও, তবে কালকের মধ্যে তোমার বাবার এই ছোট্ট ঘরটা মাটির সাথে মিশিয়ে দেব, তোমার পুরো পরিবারকে এই গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করব।"

ঈশান রাগে কাঁপতে কাঁপতে চ্যালাকাঠের মতো চেকটা কুড়িয়ে নিয়ে বাবার চোখের সামনে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিল।

"তুমি কি ভেবেছ টাকা দিয়ে সবকিছু কেনা যায়?" ঈশানের গলাটা ভয়ে নয়, রাগে থরথর করে কাঁপছিল। "তুমি আজ থেকে আমার বাবা নও। আমি তোমার এই বিলাসিতা, তোমার চৌধুরী নাম আর সম্পত্তি—সবকিছু ত্যাগ করলাম! আমি ফিয়াকে ভালোবাসি, আর ওকে সাথে নিয়েই আমি নিজের জীবন নতুন করে শুরু করব।"

রোমান চৌধুরী স্তম্ভিত হয়ে গেলেন নিজের ছেলের এই সিদ্ধান্ত দেখে। "তুমি... তুমি আমাকে ত্যাজ্য করার কথা বলছ? এই মেয়ের জন্য?"

"হ্যাঁ!" ঈশান স্পষ্ট গলায় জবাব দিল। "যেখানে মানুষের সম্মান নেই, সেখানে তোমার শত কোটি টাকার কোনো মূল্য নেই আমার কাছে।"

রোমান চৌধুরী আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না। চরম ক্রোধ আর অপমান সহ্য করে তিনি গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে হুমকি দিয়ে বলে গেলেন, "দেখে নেব তুমি এই মেয়েকে নিয়ে কতদূর যেতে পারো!"

গাড়ি দুটো ধুলো উড়িয়ে চলে যেতেই চারিদিকে এক কঠিন নীরবতা নেমে এলো। ফিয়া আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। সে ডুকরে কেঁদে উঠে ঈশানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

"আমাকে ক্ষমা করে দিন, ঈশান!" ফিয়া কেঁদে কেঁদে বলল। "আমার জন্য আপনার বাবা আপনাকে পর করে দিলেন, আপনার বিশাল সম্পত্তি আপনি হারিয়ে ফেললেন। আমি এত বড় অভিশাপ হতে পারি না আপনার জীবনে। আপনি ফিরে যান, প্লিজ!"

ঈশান নিচে নেমে এসে ফিয়াকে বুকের সাথে চেপে ধরল। সে ফিয়ার গাল দুটো ধরে তার চোখে চোখ রেখে বলল, "আমার সম্পত্তি তুমি, ফিয়া। রাজপ্রাসাদের এয়ারকন্ডিশন ঘরে আমি শান্তি পাইনি, কিন্তু তোমার এই মাটির ঘরের হাসিতে আমি আমার জীবন খুঁজে পেয়েছি। টাকা আমি আবার উপার্জন করতে পারব, কিন্তু তোমাকে হারিয়ে ফেললে আমি মরে যাব।"

ঈশানের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় ফিয়ার চোখের জল দ্বিগুণ হয়ে গেল, কিন্তু এবার তা কষ্টের নয়, চরম প্রাপ্তির।

ঈশানের দৃঢ় সিদ্ধান্ত আর ত্যাগের পর কেটে গেছে দুটি বছর। রোমান চৌধুরী সেদিন রাগের মাথায় যে হুমকি দিয়ে গিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনি তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। সন্তানের জেদ আর নিখাদ ভালোবাসার কাছে অহংকারী বাপের হিংসা চিরকালই হেরে যায়। প্রথম কয়েকটা মাস ঈশান আর ফিয়ার জীবন সহজ ছিল না। চৌধুরী বংশের সব পরিচয়, গাড়ি আর বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স এক নিমেষে পেছনে ফেলে ঈশান ঢাকায় গিয়ে নিজের যোগ্যতায় একটা ছোট আইটি স্টার্টআপ কোম্পানি চালু করে। ইউকে-র ডিগ্রি আর কঠোর পরিশ্রম কাজে লাগিয়ে অল্প দিনেই সে নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।

আর ফিয়া? সে এখন আর কেবল এক লাজুক গ্রাম্য বালিকা নয়, ঈশানের ভালোবাসায় পূর্ণতা পাওয়া এক আত্মবিশ্বাসী নারী। তাদের বিয়েটা হয়েছিল খুব সাদামাটাভাবে, গ্রামের একই আমগাছটার নিচে—যেখানে একসময় তাদের ভালোবাসার গভীর প্রকাশ ঘটেছিল।

আজ তাদের দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী।

গোধূলির লাল আলোয় পুরো গ্রামটা যেন সোনার রঙে সেজেছে। মেঠো পথের ধারে বাতাস দোলা দিচ্ছে ধানের শীষে। ফিয়া দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের সেই পুরোনো পুকুরপাড়ে। পরনে গাঢ় লাল রঙের সেই জামদানি শাড়িটি—যেটা ঈশান প্রথমবার শপিং মলে কিনে দিতে চেয়েছিল। হালকা অলংকার আর কপালে লাল টিপ, ভেজা চুল পিঠের ওপর ছড়ানো।

পেছন থেকে নিঃশব্দে এসে দুটো শক্ত হাত ফিয়ার কোমর পেঁচিয়ে ধরল। সেই চেনা স্পর্শ, সেই সুবাস!

"আজও তোমাকে সেই প্রথম দিনের মতোই রূপসী লাগছে, আমার গ্রাম্য বালিকা," ফিয়ার কানের লতিতে ঠোঁট ছোঁয়াল ঈশান।

ফিয়া ঈশানের বুকের সাথে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে মিটিমিটি হেসে বলল, "আর আপনিও আজও ঠিক আগের মতোই অভদ্র আর চঞ্চল রয়ে গেলেন! বদলালেন না একটুও।"

ঈশান ফিয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। ঈশানের চেহারায় এখন আর সেই রাজপুত্রের অহংকার নেই, আছে এক পরম তৃপ্ত পুরুষের প্রশান্তি। সে ফিয়ার গালের ওপর নেমে আসা কয়েকটা অলক চুল কানে গুঁজে দিয়ে গাঢ় স্বরে বলল, "তোমাকে পেয়ে আমি নিজেকে নতুন করে পেয়েছি, ফিয়া। রাজপ্রাসাদের সেই খাঁচাটা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছিল, কিন্তু জীবনের আসল সুখটা কেবল তুমিই দিয়েছ।"

ফিয়া ঈশানের শার্টের কলারটা চেপে ধরে আলতো করে তার বুকে মুখ রাখল। "আপনার বাবা কি এখনও আমার ওপর রাগ করে আছেন?"

ঈশান একটু হেসে ফিয়ার থুতনিটা ওপরে তুলল। "গত পরশু রিয়া ফোন করেছিল। বাবা তোমাকে আর আমাকে দেখতে চান। তোমার ওই মিষ্টি হাসি আর নিষ্পাপ মন নাকি বাবাকেও বদলে দিয়েছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন, টাকার চেয়ে মানুষের ভালোবাসা অনেক বেশি দামী।"

কথাটা শুনে ফিয়ার চোখ দুটো আনন্দে ছলছল করে উঠল। জীবনের সমস্ত কষ্টের পর এই পরম পূর্ণতা যেন তার কাছে এক স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল।

সূর্যটা তখন দিগন্তে তলিয়ে যাচ্ছে, আকাশে রক্তিম আলোর খেলা। ঈশান ফিয়ার একদম কাছে সরে এলো। ফিয়ার চোখে চোখ রেখে নিচু স্বরে বলল, "অনেক কথা তো হলো, এবার আমার উপহারের কী হবে?"

"কীসের উপহার?" ফিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

ঈশান এক অদ্ভুত দুষ্টু আর কামনাময় হাসি উপহার দিল। এক ঝটকায় ফিয়াকে নিজের কোলে তুলে নিল সে। ফিয়া চমকে উঠে ঈশানের গলা জড়িয়ে ধরে হেসে ফেলল, "ঈশান! কী করছেন? নিচে নামান, কেউ দেখে ফেলবে তো!"

"কাউকে ভয় পাই না আমি," ঈশান ফিয়ার লাল টকটকে ঠোঁটে এক দীর্ঘ, গভীর আর নিবিড় চুমু এঁকে দিল। ফিয়াও নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে সেই ছোঁয়া ফিরিয়ে দিল।

গ্রামের নির্জন গোধূলিতে, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর কুহু পাখির সুরের মাঝে দুটি প্রাণ হারিয়ে গেল পরম এক সুখের সাগরে।

....
👁 159