মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন কাচের গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে খানখান হয়ে গেল, নেহা তখন ঘরের কোণে রাখা পুরনো কাঠের টেবিলটার ওপর ঝুঁকে পড়ছে। বুকটা ভয়ে দরদর করে কাঁপছিল তার। এ আওয়াজ তার কাছে নতুন কিছু নয়। শৈশব থেকে এই আওয়াজ, বাবার হুঙ্কার আর মায়ের আকুল কান্নাই তার জীবনের প্রতিদিনের আবহসংগীত। নেহার বয়স এখন তেইশ, কিন্তু এই তেইশ বছরে সে একদিনের জন্যও স্বাধীন আকাশের নিচে নিঃশ্বাস ফেলতে পারেনি। তার বাবা ওবায়দুল সাহেব এলাকার অত্যন্ত কঠোর ও প্রভাবশালী মানুষ। তিনি মনে করেন পরিবারের সম্মান বজায় রাখার একমাত্র উপায় হলো ঘরের মেয়েদের শক্ত শৃঙ্খলে বাঁধার মধ্যে রাখা।
নেহা দেখতে ছিপছিপে, শান্ত আর অতিমাত্রায় নরম মনের এক তরুণী। হর হরিণচোখে সব সময়ই একটা শঙ্কা ভেসে উঠত। ছোটবেলা থেকেই সে দেখেছে তার মায়ের ওপর বাবার মানসিক ও শারীরিক অন্যায় আচরণ। একটু চা দিতে দেরি হলে কিংবা রান্নায় সামান্য নুন কম-বেশি হলে ওবায়দুল সাহেবের চিল্লাচিল্লি আর হাত তোলার শিকার হতে হতো মাকে। নেহা বহুবার মাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও বাবার রাগের শিকার হয়েছে। ওবায়দুল সাহেব তাকে বড় করেছেন অত্যন্ত কঠোর শাসনের মধ্যে—বাইরে যাওয়া নিষেধ, পড়াশোনা শেষ করে সোজা বাড়ি ফেরা, কোনো বন্ধুর সাথে কথা বলা যাবে না, নিজের কোনো পছন্দ-অপছন্দ থাকতে পারবে না। জীবনের প্রতিটি পদে পদে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা।
"নেহা! এখনো লাইট জ্বলছে কেন? কাল সকালে কি তোর বিয়েবাড়ি যাওয়ার কোনো চিন্তা নেই?"—বারান্দা থেকে ওবায়দুল সাহেবের কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এলো।
নেহা তড়িঘড়ি করে টেবিলের ওপর রাখা বইপত্র গুছিয়ে নিল। চোখের কোণে এক ফোঁটা জল এসে জমেছিল, সেটা ওড়নার খুঁট দিয়ে মুছে বাতিটা নিভিয়ে দিল সে। অন্ধকারের মধ্যে খাটে গিয়ে শুতেই নেহার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। তার পরিবার এখন উঠেপড়ে লেগেছে তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু নেহার মনে বিয়ের নাম শুনলেই একধরনের ভীতি কাজ করে। যে সংসারে সে দেখেছে পুরুষ মানেই অত্যাচারী, বাবা মানেই এক চরম স্বৈরাচার, সেখানে অন্য কোনো অচেনা পুরুষের হাতে নিজের জীবন সঁপে দেওয়ার কথা ভাবলেই তার গা শিউরে ওঠে। সে কোনোদিন বিয়ে করতে চায় না। সে চায় এমন একটা জীবন যেখানে অন্ততঃ নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়।
কিন্তু সেই স্বাধীনতা পাওয়ার উপায় কী? একমাত্র উপায় হলো নিজের পায়ে দাঁড়ানো। নিজের একটা চাকরি থাকা।
গোপনে গোপনে গত কয়েক মাস ধরে নেহা চাকরির চেষ্টা করছিল। ওবায়দুল সাহেবের চোখ এড়িয়ে, নিজের জমানো কিছু সামান্য টাকা দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছিল সে। অবশেষে গত সপ্তাহে একটা ইন্টারভিউ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল সে, যেখানে সে তার এক দূরসম্পর্কের বান্ধবীর সাহায্য নিয়ে বাড়ি থেকে এক ঘণ্টা সময় বের করে লুকিয়ে গিয়েছিল। আজ বিকেলে সেই ইন্টারভিউয়ের ফলাফল এসেছে। নেহা চাকরিটা পেয়েছে! ঢাকার নামকরা একটি কর্পোরেট হাউজে তার নিয়োগ হয়েছে। কিন্তু এই আনন্দের খবরের পাশাপাশি নেহার বুকের ভেতর ভয়ও চেপে বসেছে। বাবার কানে এই কথা গেলে কী হবে? তিনি কি তাকে চাকরি করতে দেবেন? কখনো না। কিন্তু নেহা ঠিক করেছে, এবার সে হার মানবে না। সে এই শেকল ভাঙবেই।
পরদিন সকালে তীব্র রোদের মধ্যে ঢাকা শহরের এক বিশালাকার গ্লাস-ঘেরা ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল নেহা। আজ তার চাকরির প্রথম দিন। সাদা রঙের সাধারণ একটা সালোয়ার-কামিজ পরা নেহার হাত-পা ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিল ভয়ে। অফিসের লিফট ধরে যখন সে পনেরো তলায় পৌঁছাল, তখন চারপাশের ব্যস্ততা আর করপোরেট পরিবেশ দেখে সে আরও গুটিয়ে গেল।
এইচআর ডিপার্টমেন্ট থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো এক্সিকিউটিভ সেকশনে। সেখানকার এক কর্মকর্তা নেহাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "নেহা, আপনার কাজ হবে সরাসরি আমাদের এমডি সাহেবের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। তবে আপনাকে একটা কথা আগেই বলে রাখি—আমাদের স্যার কিন্তু ভীষণ কঠোর আর রাগী মানুষ। কাজে বিন্দুমাত্র ভুল তিনি সহ্য করেন না। একটু এদিক-ওদিক হলেই কিন্তু চাকরি থাকবে না।"
কথাটা শুনে নেহার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। তার এমনিতেই নরম মন, কেউ একটু উচ্চস্বরে কথা বললেই তার চোখে জল চলে আসে। বাড়িতে বাবার চিৎকার শুনে সে বড় হয়েছে, এখন অফিসেও কি একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে?
"যান, ভেতরে গিয়ে স্যারের সাথে দেখা করুন," কর্মকর্তাটি তাকে এমডির রুমের দিকে দেখিয়ে দিলেন।
নেহা কাঁপতে কাঁপতে বিশাল কাঠের দরজায় আলতো করে টোকা দিল। ভেতর থেকে এক গভীর, গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠ ভেসে এলো, "ভেতরে আসুন।"
নেহা আস্তে করে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। ঘরের পুরোটা জুড়ে সুগন্ধি আর আভিজাত্যের ছাপ। বিশাল গ্লাসের জানালার সামনে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক সুপুরুষ। পরনে নিখুঁত ব্ল্যাক স্যুট, পরিপাটি চুল, আর এক হাতে কফির কাপ। নেহা ভেতরে ঢোকা মাত্রই লোকটা ঘুরে দাঁড়াল।
তিনিই আরশ। এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের সর্বময় কর্তা। তিরিশের কাছাকাছি বয়স, ধারালো চোয়াল, আর প্রখর বুদ্ধিমত্তার ছাপ তার চেহারায়। তার চোখ দুটো যেন অপরপক্ষের মনের শেষ কোণ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।
আরশ স্থির দৃষ্টিতে নেহার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চাহনিতে এমন কিছু একটা ছিল, যা দেখে নেহার বুক কেঁপে উঠল। আরশ হেঁটে এসে নিজের রাজকীয় চেয়ারটায় বসল এবং নেহার ফাইলের দিকে চোখ বুলাল।
"নেহা আফরিন," আরশের গলা থেকে যেন বরফ ঝরছিল। "তোমার সিভি দেখলাম। শিক্ষাগত যোগ্যতা ভালো, তবে এই কর্পোরেট জগতে টিকে থাকার মতো মানসিক শক্তি তোমার আছে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। আমি অলসতা, ভয় আর ভুল—এই তিনটে জিনিস একদম সহ্য করি না।"
নেহা নিচু গলায় বলল, "জি... জি স্যার। আমি আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব।"
"চেষ্টা নয়, আমার নিখুঁত কাজ চাই," আরশ টেবিলের ওপর ফাইলটা সশব্দে রেখে বলল। শব্দটায় নেহা চমকে উঠে দু-পা পিছিয়ে গেল।
আরশ নেহার এই ভয় পাওয়া রূপটা দেখে এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার গভীর চোখ দুটো অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে নেহার ভীত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল, "তুমি বড্ড বেশি ভয় পাও, নেহা। বাড়ি থেকেও কি এত ভয় নিয়েই চলতে হয়, নাকি ভয়টাই তোমার অভ্যাস?"
নেহা অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাল। একজন নতুন বসের মুখে এমন ব্যক্তিগত কথা শুনে সে খটকা খেল। কথাটার মানে কী? বস কীভাবে জানলেন যে সে ভয় পায় বা তার বাড়ির পরিবেশ কেমন?
কিন্তু নেহা কোনো উত্তর দিতে পারল না। আরশ আবার তার স্বাভাবিক কঠোর কণ্ঠে ফিরে গিয়ে বলল, "আজকের ফাইলগুলো টেবিলে রাখা আছে, বিকাল পাঁচটার মধ্যে সামারি চাই। ইউ মে গো নাউ।"
নেহা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছিল। একদিকে চাকরি পাওয়ার স্বস্তি, অন্যদিকে এই রূঢ় আর রহস্যময় বসের ভয়। কিন্তু সে জানত না, তার জীবনের আসল মোড় কেবল শুরু হতে যাচ্ছে, এবং এই আরশ কেবল তার বসই নয়—তার ভাগ্যের সাথে এক অন্যরকম সুতোয় বাঁধা পড়তে চলেছে।
প্রথম দিনের কাজের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নেহার দিনগুলো এক অজানা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে কাটতে লাগল। অফিসে কাজের চাপ যেমন ছিল, তেমনই ছিল আরশের চরম মেজাজ। সামান্যতম ভুলের জন্য আরশের কর্কশ মেজাজ সহ্য করতে হতো পুরো অফিসকে। নেহা তো একটুেই কেঁদে ফেলত। কতদিন যে ওয়াশরুমে গিয়ে গোপনে চোখ মুছে এসে আবার ফাইল হাতে কাজ শুরু করতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, আরশ সবাইকে বকাঝকা করলেও নেহার ওপর সরাসরি কখনো চিৎকার করেনি। তবে তার দেখার চাহনি আর অদ্ভুত কিছু কথাবার্তা নেহাকে দিন দিন আরও বেশি বিভ্রান্ত করে তুলছিল।
একদিন বিকেলে নেহা আরশের টেবিলে এক গ্লাস পানি রেখে চলে আসতে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই আরশ ফাইল থেকে চোখ না তুলে হুট করে বলে উঠল, "যাদের নিজের ঘরেই শান্তি নেই, তারা বাইরেও এত অস্থির থাকে কেন বলতো, নেহা?"
নেহা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। দরজার হাতলে রাখা তার হাতটা কাঁপতে লাগল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক কণ্ঠে বলল, "স্যার... কিছু বলছেন?"
আরশ চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর চেয়ারে হেলে বসে গভীর দৃষ্টিতে নেহার দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি কি সবসময় এভাবেই ভয় পেয়ে থাকবে? কেউ তোমার ওপর অন্যায় করছে জেনেও চুপচাপ সয়ে যাওয়াটা কিন্তু কোনো মহানুভবতা নয়। ওটা দুর্বলতা।"
নেহা কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, আরশ যেন তার ভেতরের সমস্ত গোপন ক্ষতগুলো দেখতে পাচ্ছে। সে তো কখনো তার বাবার অত্যাচার কিংবা পরিবারের কষ্টের কথা অফিসে কাউকে বলেনি! তবে এই বস কীভাবে এত কিছু আঁচ করতে পারে? নেহা আমতা আমতা করে বলল, "স্যার, আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার ফাইলগুলোতে কি কোনো ভুল আছে?"
আরশ একটা হালকা, রহস্যময় হাসি হাসল। সে উঠে দাঁড়িয়ে নেহার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো। আরশের লম্বা, ভারী শরীরটা নেহার খুব কাছে আসতেই নেহা অস্বস্তিতে এক পা পিছিয়ে গেল।
আরশ নেহার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, "ফাইলে কোনো ভুল নেই, নেহা। ভুল তোমার জীবনে। তুমি মুক্তির পথ খুঁজছ, কিন্তু খাঁচা ছেড়ে বের হতে ভয় পাচ্ছ। আর কতদিন এই খাঁচায় থাকবে?"
নেহার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। এই কথাগুলোর আসল অর্থ কী? আরশ কি কেবল একজন কঠোর বস, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ইঙ্গিত আছে? নেহা কিছু না বুঝে শুধু বলল, "স্যার, আমার বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেছে। আমি কি আসব?"
আরশ তাকে বাধা দিল না। শুধু বলল, "হুম, যাও। তবে মনে রেখো, আলো পেতে হলে অন্ধকারের মুখোমুখি হতেই হয়।"
নেহা প্রায় দৌড়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এলো। বাসে বসে পুরোটা পথ সে শুধু আরশের কথাগুলোই ভাবল। বসের এই রহস্যময় আচরণ আর ইশারায় বলা কথাগুলো সে একদমই মাথায় ঢোকাতে পারছিল না। তার সহজ-সরল মন শুধু এটুকু বুঝত—অফিসে তাকে মন দিয়ে কাজ করতে হবে, নইলে এই চাকরিটা চলে গেলে সে চিরতরে বাবার শিকলে আটকা পড়ে যাবে।
বাড়ি পৌঁছাতেই প্রতিদিনের চেনা দৃশ্যটা আবার তার সামনে ভেসে উঠল। ওবায়দুল সাহেব বসার ঘরে বসে হুঙ্কার ছাড়ছিলেন। নেহার মা রান্নাঘরের এক কোণে বসে হাত দিয়ে চোখ মুছছিলেন।
"কোথায় ছিলি এতক্ষণ?" ওবায়দুল সাহেবের গর্জন শুনে নেহার পা থমকে গেল।
নেহা বুক চেপে ধরে নিচু গলায় বলল, "বাবা... কাজের একটু চাপ ছিল, তাই দেরি হলো।"
"কাজের চাপ! এক মেয়েমানুষের আবার কিসের এত কাজ? ঘরে এত কাজ পড়ে আছে, আর তুই বাইরে গিয়ে নবাবী করছিস? কাল থেকে আর কোনো চাকরি-বাকরি নয়। আমি তোর বিয়ের জন্য পাত্র দেখে ফেলেছি। আগামী মাসেই তোর বিয়ে।" ওবায়দুল সাহেবের কথাগুলো নেহার মাথায় যেন বাজ হয়ে পড়ল।
"বি... বিয়ে?" নেহা কেঁদে ফেলল। "বাবার পায়ে ধরে বলছি, আমাকে এখন বিয়ে দিও না। আমি চাকরিটা করতে চাই। আমি নিজের মতো বাঁচতে চাই।"
ওবায়দুল সাহেব এগিয়ে এসে নেহার চুল শক্ত করে ধরে বললেন, "মুখ সামলে কথা বলবি! আমার সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত। এই ঘরে তোর কোনো স্বাধীনতা নেই, যেমনটা তোর মায়েরও নেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোকে এই ঘরেই আটকে রাখব।"
মা ছুটে এসে নেহাকে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন, "মেয়েটাকে মেরো না গো! ও তো কোনো ভুল করেনি।" কিন্তু ওবায়দুল সাহেব কোনো তোয়াক্কা না করে ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকে দেওয়ার হুমকি দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।
পরদিন সকালে অফিসে এসে নেহা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। চোখেমুখে কান্নার ছাপ, ফোলা চোখ আর মলিন মুখ নিয়ে সে যখন আরশের কেবিনে কফির কাপ রাখতে গেল, তখন তার হাতটা কেঁপে উঠল। গরম কফি সামান্য ছিটকে পড়ল টেবিলে রাখা একটা ফাইলের ওপর।
নেহা ভয়ে একপ্রকার আতঙ্কে কেঁদে উঠল, "সো... সো সরি স্যার! আমি ইচ্ছা করে করিনি। দয়া করে আমাকে বকবেন না, আমার চাকরিটা কাটবেন না স্যার! আমি সব পরিষ্কার করে দিচ্ছি।"
আরশ চেয়ার ছেড়ে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল। কিন্তু সে কিন্তু রাগল না। নেহার চোখের জল দেখে তার ধারালো মুখাবয়ব যেন মুহূর্তের মধ্যে নরম হয়ে গেল। আরশ দ্রুত এগিয়ে এসে নেহার কাঁধ চেপে ধরল।
"নেহা! স্টপ ইট! শান্ত হও," আরশের গলা থেকে কঠোরতা গায়েব হয়ে এক অদ্ভুত কোমলতা ঝরে পড়ল।
নেহা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আমি আর পারছি না স্যার... আমার সব শেষ হয়ে যাবে। বাবা আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবে..."
আরশ নেহার হাত দুটো আলতো করে ধরে তার নিজের হাতের মুঠোয় নিল। নেহা চমকে উঠে আরশের দিকে তাকাল। আরশের চোখে এখন আর সেই রাগী বসের ভাব নেই, সেখানে রয়েছে এক তীব্র অধিকারবোধ আর প্রচ্ছন্ন ভালোবাসা।
আরশ নেহার চোখের জল আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে খুব নিচু, কিন্তু শক্ত গলায় বলল, "কেউ তোমার অমতে কিছু করতে পারবে না, নেহা। তোমার ওপর জোর করার অধিকার আমি কাউকে দিইনি, এমনকি তোমার বাবাকেও না। তুমি শুধু আমার দিকে তাকাও।"
নেহা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। আরশের এই স্পর্শ, তার এই কথা—সবকিছুই কেমন যেন অবিশ্বাস্য লাগছিল।
আরশ নেহার থুতনিটা হালকা উঁচিয়ে ধরে সরাসরি তার চোখে চোখ রেখে বলল, "যে শেকল তোমাকে আটকে রাখতে চায়, সে শেকল আমি ভেঙে গুঁড়ো করে দেব। তুমি কি এখনো বুঝতে পারছ না, নেহা? তুমি কারো বন্দি নও... তুমি শুধু আমার।"
নেহা হঠাতই এক গভীর গোলকধাঁধায় পড়ে গেল। আরশ তাকে কী বলতে চাইছে? এই কঠোর মানুষটি কি তাকে ভালোবাসে? নাকি এ-ও কোনো নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস?
আরশের কথাগুলো নেহার মনে প্রবল ঝড়ের সৃষ্টি করল। "তুমি শুধু আমার"—এই চারটে শব্দ নেহার সারাদিনের চিন্তাভাবনা ওলটপালট করে দিল। কিন্তু তার সরল মন এখনো সবকিছু পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিল না। একজন বিশাল মাপের শিল্পপতি, এত বড় কোম্পানির মালিক হয়ে আরশ কেন তার মতো এক সাধারণ, অসহায় মেয়েকে ভালোবাসবে? নাকি এটা কেবলই কোনো সান্ত্বনা? নেহা নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—তার মূল লক্ষ্য চাকরিটা বাঁচানো, এই আবেগে ভেসে যাওয়া তার সাজে না।
কিন্তু পরিস্থিতি তার চিন্তা করার সময়টুকুও দিল না। দু’দিন পর বাড়ি ফিরতেই নেহা দেখল ঘরে এক অচেনা নীরবতা। ওবায়দুল সাহেব ড্রয়িংরুমে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন, আর টেবিলে কিছু মিষ্টির প্যাকেট রাখা।
নেহা ভেতরে ঢুকতেই ওবায়দুল সাহেব কর্কশ গলায় বললেন, "তোর বিয়ের সব কথা পাকা হয়ে গেছে। আগামী শুক্রবার বরপক্ষ আসবে। এবার তোর কোনো বাহানা আমি শুনব না। আর কাল থেকেই অফিসে যাওয়া বন্ধ।"
কথাটা শুনে নেহার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। সে কাঁদতে কাঁদতে বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল, "বাবা, আমি আকুল হয়ে ভিক্ষা চাচ্ছি, আমার জীবনের ক্ষতি করো না! আমি এই বিয়ে করব না। আমাকে কাজ করতে দাও, আমি অন্তত নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই!"
"চুপ কর!" ওবায়দুল সাহেব গর্জে উঠলেন। "তোর পায়ে দাঁড়ানোর কোনো দরকার নেই। মেয়েদের কাজ হলো স্বামীর সংসার সামলানো। বেশি চিল্লাচিল্লি করলে তোকে ঘরের কোণে বেঁধে রাখব, যেমনটা তোর মাকে রেখেছি।"
নেহা মায়ের দিকে তাকাল। কিন্তু মা শুধু নীরবে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে চোখের জল ফেলছেন। তিনি নিজেও যে বাবার কাছে এক বন্দি পাখি, তার কাছে সাহায্যের আশা করা বৃথা। নেহা নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে অঝোরে কাঁদতে লাগল। তার মনে হতে লাগল, তার সব স্বপ্ন শেষ, মুক্তি পাওয়ার সমস্ত দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
পরদিন সকালে ওবায়দুল সাহেব তাকে অফিসে যেতে বাধা দিলেন না কেবল শেষবারের মতো কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার জন্য। নেহা শুকনো মুখে, লাল লাল ফোলা চোখ নিয়ে অফিসে পৌঁছাল।
আরশের কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার হাত কাঁপছিল। সে ভেতরে ঢুকে কোনোমতে রেজিশনেশন লেটারটা আরশের টেবিলের ওপর রাখল।
আরশ ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে এক নজর চিঠির দিকে তাকাল, তারপর তাকাল নেহার ভেঙে পড়া মুখের দিকে। তার ধারালো চোখের দৃষ্টি হঠাৎ তীব্র ও হিংস্র হয়ে উঠল।
"এটার মানে কী, নেহা?" আরশের গলা থেকে যেন বিদ্যুৎ ঠিকরে বের হলো।
নেহা চোখ নিচু করে কেঁদে ফেলে বলল, "স্যার... বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন। কাল থেকে আমার অফিসে আসা নিষেধ। আমি... আমি আর চাকরিটা করতে পারব না। আমার ইস্তফাপত্রটা গ্রহণ করুন।"
আরশ একঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে সোজা এগিয়ে এসে নেহার একদম মুখোমুখি এসে থামল। নেহা ভয়ে দু-পা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আরশ তার এক হাত দিয়ে নেহার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের কাছাকাছি টেনে আনল।
নেহার বুকটা আতঙ্কে আর এক অজানা শিহরণে ধড়ফড় করে উঠল। সে আরশের শক্ত বুকের সাথে মিশে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল, "স... স্যার! এটা কী করছেন? ছাড়ুন আমাকে!"
আরশ থামল না। সে অন্য হাত দিয়ে নেহার ফর্সা মুখখানা শক্ত করে ধরে উঁচু করল। আরশের চোখ দুটো তখন রাগে ও গভীর লালসায় দাউদাউ করে জ্বলছিল।
"বিয়ে?" আরশ ফিসফিস করে বলল, তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস নেহার গালে আছড়ে পড়ছিল। "তোমাকে বিয়ে দেওয়ার সাহস তোমার বাবার হয় কীভাবে? তুমি কি ভেবেছ আমি তোমাকে এত সহজে অন্য কারো হতে দেব?"
"স্যার, প্লিজ... আমার বাবা অনেক খিটখিটে আর কড়া মানুষ। তিনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা পাল্টাবেন না," নেহা ফুঁপিয়ে উঠল।
আরশ এক ত্যাজ্য হাসি হাসল। "তোমার বাবা কড়া? তবে তিনি এখনো আরশ চৌধুরীকে চেনেননি। আমি যা চাই, তা যেকোনো মূল্যে আদায় করে নিই। আর তোমাকে... তোমাকে আমি প্রথম দিন থেকেই নিজের করে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।"
নেহা হতবাক হয়ে গেল। আরশের মুখের এত কাছাকাছি এসে তার নিজের নিঃশ্বাস আটকে আসছিল।
সেদিন বিকেলে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিল।
আরশ কোনো সময় নষ্ট না করে নিজের দামী গাড়ি নিয়ে সোজা হাজির হলো নেহাদের বাড়িতে। সাথে তার দুজন বডিগার্ড। ওবায়দুল সাহেব হঠাৎ এমন এক প্রভাবশালী ও বিত্তশালী মানুষকে তাদের সাধারণ বাড়িতে দেখে অবাক হলেন।
আরশ কোনো ভূমিকা না করেই ড্রয়িংরুমে সোজা বসে পড়ল। তার পরনে ছিল ব্ল্যাক কোট-প্যান্ট, চোখে এক অদ্ভুত অহংকার আর গাম্ভীর্য।
ওবায়দুল সাহেব নম্র সুরে বললেন, "আপনি... আপনি আরশ চৌধুরী না? হঠাৎ আমার এই গরীবের ঘরে? কোনো বিশেষ কারণ?"
আরশ পা ওপর পা তুলে শান্ত গলায় বলল, "জি, কারণ আছে। আমি আপনার মেয়ে নেহাকে বিয়ে করতে চাই।"
ওবায়দুল সাহেব চমকে উঠলেন। নেহা দরজার আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল, তার বুক দুরুদুরু করে কাঁপছিল।
কিন্তু ওবায়দুল সাহেবের ভেতরের পুরোনো স্বৈরাচারী মনোভাব জেগে উঠল। তিনি একজন পরপুরুষ এসে এভাবে তাঁর ঘরে প্রস্তাব দেবে তা সহ্য করতে পারলেন না। তাছাড়া নেহাকে তিনি যেখানে ঠিক করেছেন, সেখানে অনেক টাকা-পয়সার লেনদেন ছিল।
ওবায়দুল সাহেব নিজেকে সামলে নিয়ে একটু কড়া গলায় বললেন, "আমার মেয়ের বিয়ে আমি অন্য জায়গায় ঠিক করে ফেলেছি। আপনার মতো বড়লোকের সাথে আমাদের মেলামেশা সাজে না। তাছাড়া নেহা আমার মেয়ে, তার বিয়ে কোথায় হবে না হবে সেই সিদ্ধান্ত শুধু আমি নেব। আমি আপনার এই প্রস্তাব নাকচ করছি।"
কথাটা শোনামাত্রই আরশের চেহারার শান্ত ভাবটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তার চোখের তারায় নেমে এলো এক হিংস্র অন্ধকার।
আরশ ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার গায়ের থেকে এক চরম ভীতিজনক তেজ বের হচ্ছিল। সে ওবায়দুল সাহেবের দিকে দু-পা এগিয়ে গিয়ে শান্ত অথচ হাড়হিম করা কণ্ঠে বলল, "আপনি প্রস্তাব নাকচ করার কে, ওবায়দুল সাহেব? আমি আপনাকে সম্মান দিয়ে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু মনে রাখবেন, আরশ চৌধুরী কোনো কিছু চেয়ে খালি হাতে ফিরে যায় না।"
ওবায়দুল সাহেব একটু ভয় পেলেন, কিন্তু নিজের অহংকার বজায় রেখে বললেন, "আপনি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন? এটা আমার ঘর! বের হয়ে যান এখান থেকে!"
আরশ এক শীতল হাসি হাসল। সে পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে একটা শর্ট মেসেজ পাঠাল, তারপর ওবায়দুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনার এই অহংকার আর আপনার স্ত্রী-সন্তানের ওপর চালানো এই অত্যাচার... খুব শীঘ্রই এর মাশুল আপনাকে দিতে হবে। নেহা শুধু আমার, আর তাকে আমি কীভাবে নিজের করে নেব, সেটা আপনি কল্পনাকাতর হয়ে দেখতে থাকবেন।"
আরশ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার যাওয়ার পথে নেহার দিকে একপলক তাকাল—যে দৃষ্টিতে ছিল এক স্পষ্ট অঙ্গীকার।
ওবায়দুল সাহেব রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নেহার ওপর চড়াও হলেন, "তুই একে চড়াতে গিয়েছিলি? অফিসে গিয়ে এই ন্যাকামো করেছিস? দাঁড়া, আজই তোর ব্যবস্থা করছি!"
নেহা কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। কিন্তু সে জানত না, বাইরের অন্ধকার রাতটি তাদের জন্য কী বিশাল এক ঝড় বয়ে আনছে। আরশ যে রূপ আজ দেখিয়ে গেল, তার পরিণাম কতটা ভয়ঙ্কর ও অনভিপ্রেত হতে চলেছে, তা নেহার কল্পনারও বাইরে ছিল।
আরশ চলে যাওয়ার পর ওবায়দুল সাহেবের রাগ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন, পরদিনই গোপনে নেহার বিয়ে সম্পন্ন করবেন। নেহাকে তার ঘরে আটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হলো। মায়ের কান্না বা নেহার আকুল আকুতি—কোনো কিছুই ওবায়দুল সাহেবের পাষাণ মনকে গলাতে পারল না। নেহা অন্ধকার ঘরে বসে জানালার দিকে তাকিয়ে শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তার মনে হচ্ছিল, তার জীবনের সমস্ত আলো চিরতরে মুছে গেল।
রাত তখন গভীর। আনুমানিক প্রায় তিনটে। চারপাশ নিঝুম অন্ধকারে আচ্ছন্ন।
হঠাৎ করেই নেহাদের বাড়ির উঠোনে পর পর দুটো দামী গাড়ির বিকট ব্রেকের শব্দ হলো। ঘরের সবাই চমকে উঠে বসল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুট করে বিকট শব্দে সদর দরজাটা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করল কয়েকজন সশস্ত্র লোক। ওবায়দুল সাহেব ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘর থেকে বের হতেই তার সামনে এসে দাঁড়াল সেই মূর্তিমান আতঙ্ক—আরশ চৌধুরী।
আরশের পরনে কালচে শার্ট, হাত দুটো পকেটে পোরা। তার মুখে এক নিষ্ঠুর ও শান্ত হাসি।
"আপনি... আপনি এ কী করছেন? পুলিশ ডাকব আমি!" ওবায়দুল সাহেব চিল্লাতে চাইলেন, কিন্তু আরশের বডিগার্ডরা মুহূর্তের মধ্যে তার মুখ চেপে ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। নেহার মা ভীতিজনকভাবে চিৎকার করে উঠলেন।
আরশ ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে নেহার বন্ধ দরজার তালাটা নিজের এক লাথিতে ভেঙে ফেলল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সে দেখতে পেল নেহা ঘরের কোণে ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে, তার চোখে চরম বিস্ময় ও আতঙ্ক।
আরশ নেহার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "এসো, নেহা।"
নেহা ভয়ে পেছাতে পেছাতে বলল, "স... স্যার! আপনি এ কী করছেন? আমার পরিবারকে ছেড়ে দিন, প্লিজ!"
আরশ কোনো কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে এসে নেহাকে এক হ্যাঁচকায় কোল তুলে নিল। নেহা ছটফট করে উঠল, "না! স্যার ছাড়ুন! বাবা... মা..."
"চুপ!" আরশের গভীর কণ্ঠের এক হুঙ্কারে নেহা স্তব্ধ হয়ে গেল। আরশ তার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, "আমি তোমাকে বলেছিলাম না নেহা, আরশ চৌধুরী যা চায় তা আদায় করে নেয়। তুমি সহজ পথে আসতে চাওনি, তাই আমাকে এই পথ বেছে নিতে হলো।"
আরশ নেহাকে কোলে নিয়েই ঘর থেকে বের হয়ে এলো। ওবায়দুল সাহেব অসহায়ভাবে ছটফট করছিলেন, কিন্তু কিছু করার শক্তি তার ছিল না। আরশ ওবায়দুল সাহেবের সামনে এসে দাঁড়িয়ে এক ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল, "মেয়ের বিয়ে দেওয়ার খুব শখ ছিল না আপনার? চিন্তা করবেন না, আজ রাতেই আপনার মেয়ের বিয়ে হবে। তবে আপনার পছন্দের সেই পাত্রের সাথে নয়... আমার সাথে। আর আপনাকে কীভাবে শিক্ষা দিতে হয়, তা আমি ভালো করেই জানি।"
নেহার মায়ের করুণ চাওনির দিকে তাকিয়ে আরশ শান্ত গলায় বলল, "আপনি ভয় পাবেন না। নেহা আমার কাছে নিরাপদে থাকবে।"
আরশ নেহাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি দ্রুত গতিতে ছুটে চলল শহরের এক নির্জন প্রান্তের দিকে, যেখানে আরশের নিজস্ব এক বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদসম বাংলো বাড়ি অবস্থিত।
বাংলোয় পৌঁছানোর পর নেহাকে সোজা একটা বিশাল, আলোঝলমলে শোবার ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘরটা আগে থেকেই লাল গোলাপ, রজনীগন্ধা আর সুগন্ধি মোমবাতি দিয়ে রাজকীয়ভাবে সাজানো ছিল। নেহার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার মানে আরশ এই অপহরণের পরিকল্পনা আগেই করে রেখেছিল!
ঘরে এক কাজী সাহেব এবং দুজন সাক্ষী আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। নেহাকে কোনো চিন্তার সুযোগ না দিয়ে তার সামনে বিয়ের দলিল রাখা হলো।
"স্বাক্ষর করো, নেহা," আরশ পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
নেহা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "স্যার... এভাবে জোর করে বিয়ে হয় না। আমি ভয় পাচ্ছি..."
আরশ নেহার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসল। তার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম মমতায় বলল, "নেহা, আমি তোমাকে কোনোদিন কষ্ট দেব না। ওই নরক থেকে তোমাকে বের করে আনার এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় ছিল না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, আর আজ থেকে তুমি আমার স্ত্রী। সই করো, প্লিজ।"
আরশের চোখের সেই গভীর আকুলতা আর স্পষ্ট অধিকারবোধ দেখে নেহার আর কোনো বারণ কাজ করল না। সে থরথর করে কাঁপা হাতে কাবিননামায় সই করে দিল। কাজীর দোয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাদের বিয়ে।
মেহমান ও কাজী সাহেব চলে যাওয়ার পর ঘরে শুধু রইল আরশ আর নেহা। নেহা খাটের এক কোণে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে ভয়ে ও লজ্জায় বসে ছিল।
আরশ আস্তে আস্তে দরজার ছিটকিনি আটকে দিল। ঘরে কেবল সুগন্ধি মোমবাতির হালকা লালচে আলো আর গোলাপের সুবাস। আরশ ধীর পায়ে হেঁটে এসে নেহার পাশে খাটে বসল।
নেহার বুক ধড়ফড় করছিল। আরশ তার বিশাল হাত দিয়ে নেহার চিবুক উঁচিয়ে ধরল। নেহা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
আরশ আলতো করে তার ঠোঁট দিয়ে নেহার চোখের জলটুকু মুছে দিল। তারপর পরম ভালোবাসায় নেহার কপালে তার উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ দিল।
"আজ থেকে তুমি মুক্ত, নেহা। আর কোনো ভয় নেই, কোনো কান্নাকাটি নেই," আরশ ফিসফিস করে বলল।
নেহা চোখ মেলে তাকাল। আরশের চোখে তখন ভালোবাসার এক অসীম সমুদ্র, যার মধ্যে ডুবে যেতে কোনো ভয় নেই। আরশ ধীরে ধীরে নেহাকে নিজের বুকের কাছাকাছি টেনে নিল। নেহার পাতলা ঠোঁট দুটো আরশের উষ্ণ ছোঁয়ায় কেঁপে উঠল। সেই নিঝুম রাতে, এক বন্দিনী মেয়েটি পরিণত হলো আরশের একান্ত রাজরানী ও সহধর্মিনীতে, শুরু হলো তাদের অনুরাগে ভরা এক নতুন অধ্যায়।
সকালের সোনালী রোদ এসে পড়ল রাজকীয় ঘরটার বড় কাচের জানালার ওপর। নেহার চোখের পাতা দুটো ধীরে ধীরে খুলে গেল। শরীরের প্রতিটি কোণে এক অদ্ভুত অচেনা অনুভূতি আর ক্লান্তি। সে নিজেকে আবিষ্কার করল আরশের শক্ত ও উষ্ণ বুকের মাঝে। আরশের একটা ভারী হাত নেহার কোমর পেঁচিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন একটু আলগা হলেই নেহা হারিয়ে যাবে।
গতকাল রাতের কথাগুলো মনে পড়তেই নেহার ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। যে মানুষকে সে কড়া বস হিসেবে চিনে এসেছিল, যে মানুষকে সে এতদিন বাঘের মতো ভয় পেত—সেই মানুষটাই গত রাতে তার প্রতিটা ছোঁয়াতে, প্রতিটা চুমুতে কতটা ব্যাকুল আর ব্যাকুলতার সাথে সাথে কতটা মমতাময় ছিল! কোনো জোর নয়, কেবল এক তীব্র অনুরাগে সে নেহাকে নিজের করে নিয়েছে।
নেহা আলতো করে আরশের বুকের ওপর হাত রাখল। আরশের শান্ত ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এই মানুষটা রুক্ষ হতে পারে, কিন্তু তার মনটা নেহার জন্য এক বিশাল ভালোবাসার সমাহার।
ঠিক তখনই আরশের চোখ দুটো খুলে গেল। ঘুমভাঙা গভীর চোখে সে তাকাল নেহার লাল হয়ে থাকা লজ্জিত মুখের দিকে। আরশের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিজয়ের মিষ্টি হাসি। সে নেহাকে আরও কিছুটা টেনে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল।
"সুপ্রভাত, আমার স্ত্রী," আরশ নিচু ও ভারী গলায় বলল। তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস নেহার ঘাড়ে আছড়ে পড়ছিল।
নেহা লজ্জায় আরশের বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "স... স্যার, ছাড়ুন। সকাল হয়ে গেছে।"
আরশ একহাতে নেহার চিবুকটা ধরে মুখটা উঁচিয়ে আনল। তার চোখে রসিকতার ঝলক। "এখনো 'স্যার'? কাল রাতেও কি আমি তোমার শুধু 'স্যার' ছিলাম, নেহা?"
কথাটা শুনে নেহা লজ্জায় লাল হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। আরশ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ঝুঁকে এসে নেহার গোলাপি ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এক দীর্ঘ ও গভীর চুমুর পর আরশ সরে এসে নেহার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, "আজ থেকে আমি তোমার শুধু আরশ। আর কখনো আমাকে 'স্যার' বলবে না।"
নেহা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। এই প্রথম তার মনে হলো, কোনো পুরুষের সান্নিধ্যে থেকে সে ভয় পাচ্ছে না, বরং এক পরম নিরাপত্তা অনুভব করছে।
বিকেলের দিকে বাংলোর ড্রয়িংরুমে এক নতুন ঘটনা ঘটল। আরশ তার ল্যাপটপে কাজ করছিল, আর নেহা তার জন্য চা নিয়ে এসেছিল।
ঠিক তখনই অফিসের এক বয়স্ক বিশ্বস্ত ম্যানেজার কিছু ফাইল নিয়ে হাজির হলেন। কাজের কথা শেষ হওয়ার পর লোকটা ওবায়দুল সাহেবের কথা তুললেন।
"স্যার, আপনি যেমনটা বলেছিলেন, ওবায়দুল সাহেবের সব অবৈধ ব্যবসার ফাইল ও তার ট্যাক্স ফাঁকির সমস্ত প্রমাণপত্র পুলিশ কমিশনারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ যেকোনো সময় তাকে গ্রেফতার করতে পারে।"
কথাটা শোনামাত্রই নেহার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিচে পড়ে ভেঙে গেল। সে আতঙ্কে আরশের দিকে তাকাল। "আরশ! তুমি বাবাকে জেলে পাঠাচ্ছ? প্লিজ এমন করো না! তিনি যতই খারাপ হোন, তিনি আমার বাবা!"
আরশ ম্যানেজারকে চলে যেতে ইশারা করল। তারপর সে নেহার কাছে এসে তার দুটো হাত শক্ত করে ধরে এক গম্ভীর গলায় বলল, "নেহা, তোমার বাবা এতদিন ধরে যে অন্যায়গুলো করে এসেছে, তার একটা শিক্ষা পাওয়া দরকার। তিনি শুধু তোমাকেই নয়, তোমার মাকেও সারা জীবন অত্যাচার করেছেন। অপরাধী যদি তার ভুলের মাশুল না দেয়, তবে সে কোনোদিন মানুষ হবে না।"
নেহা চোখে জল নিয়ে বলল, "কিন্তু পুলিশ... জেল... এসব যে সহ্য করতে পারবেন না তিনি!"
আরশ নেহার চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, "আমি তাকে সারাজীবন জেলে পচানোর জন্য এটা করিনি। এটা শুধু একটা ধাক্কা, যাতে তার ভেতরের অহংকার আর স্বৈরাচারী মানসিকতা ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায়। ট্রাস্ট মি, নেহা। আমি সব সামলে নেব।"
সেই রাতেই পুলিশ ওবায়দুল সাহেবের বাড়িতে হানা দিল। ওবায়দুল সাহেবকে হাতকড়া পরা অবস্থায় থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি সারা জীবন ক্ষমতার বড়াই করে এসেছিলেন, আজ তিনি পুলিশের সামনে নিঃস্ব ও অসহায়। থানায় বসে তিনি নিজের করা সমস্ত অপকর্মের কথা ভাবতে লাগলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, যার সাথে তিনি শত্রুতা করতে গিয়েছেন, সেই আরশ চৌধুরী তাকে মুহূর্তের মধ্যে পথে বসিয়ে দিতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় আঘাতটা তিনি পেলেন যখন দেখলেন, তাকে বাঁচাতে কোনো আত্মীয় বা বন্ধু এগিয়ে এলো না। কিন্তু পরদিন সকালে থানায় উপস্থিত হলো এক অপ্রত্যাশিত অতিথি—যে আর কেউ নয়, স্বয়ং আরশ চৌধুরী।
জেলখানার গরাদের ওপাশ থেকে ওবায়দুল সাহেব ভীতি ও ক্ষোভের চোখে আরশের দিকে তাকালেন।
আরশ শান্ত পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো চঞ্চলতা ছিল না, ছিল এক কঠিন স্থিরতা।
"কেমন আছেন, শ্বশুরমশাই?" আরশের কণ্ঠে এক অদ্ভুত শীতলতা ঝরে পড়ল।
ওবায়দুল সাহেব গর্জে উঠলেন, "তুই... তুই আমার মেয়েকে চুরি করেছিস! আমার এত বড় ক্ষতি করেছিস! তোকে আমি ছাড়ব না!"
আরশ এক হালকা হাসি হাসল। সে পকেট থেকে এক সেট বরখাস্তপত্র ও জামিনের কাগজ বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
"আমি আপনাকে এক মিনিটে এখান থেকে বের করতে পারি, আবার এক মিনিটে সারাজীবনের জন্য এই অন্ধকুঠুরিতে বন্দি রাখতে পারি," আরশ শান্ত গলায় বলল। "কিন্তু আজ আমি এখানে প্রতিশোধ নিতে আসিনি। এসেছে আপনাকে একটা শেষ সুযোগ দিতে।"
ওবায়দুল সাহেব স্তব্ধ হয়ে আরশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আরশের পরবর্তী কথাগুলো শুনে তার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।
জেলখানার স্যাঁতসেঁতে আলোয় ওবায়দুল সাহেব নিষ্পলক চোখে আরশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে অহংকার আর ক্ষমতাকে তিনি সারাজীবন মূলধন মনে করে এসেছিলেন, আজ তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
আরশ টেবিলের ওপর জামিনের কাগজগুলো আলতো করে ঠেলে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, "আজ আপনার জামিনের ব্যবস্থা আমিই করে দিচ্ছি, ওবায়দুল সাহেব। তবে একটা শর্ত আছে। এই শর্ত কোনো চুক্তির নয়, এটা এক মেয়ের জীবনের নিশ্চয়তা।"
ওবায়দুল সাহেবের গলা শুকিয়ে এলো। তিনি নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, "কী... কী শর্ত?"
আরশ সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে এক কঠিন ও ধারালো চাহনি, "সারাজীবন আপনি আপনার স্ত্রীর ওপর যে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার করেছেন, তা এখানেই শেষ হতে হবে। নেহার মা কোনো বন্দি নন, তিনি আপনার সহধর্মিনী। আর নেহা... সে এখন আরশ চৌধুরীর স্ত্রী। তার দিকে যদি কখনো কোনো আক্রোশের নজর পড়ে, তবে এই জামিনের কাগজটা বাতিল হতে এক মুহূর্তও সময় লাগবে না। আপনি কি বুঝতে পারছেন আমি কী বলছি?"
ওবায়দুল সাহেবের মাথাটা নত হয়ে গেল। সারাজীবন যাদের তিনি দুর্বল ভেবে চাবুক চালিয়েছেন, আজ তাদের ভালোবাসার শক্তিতেই তিনি পরাজিত। নিজের ভুলের তীব্র অনুশোচনা তার বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে গুঁড়ো করে দিল। তিনি কাঁদতে কাঁদতে নিচু গলায় বললেন, "আমি... আমি বুঝতে পেরেছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও, বাবা। আমি সত্যিই খুব বড় অপরাধী।"
আরশ আর কথা বাড়াল না। ইশারা করতেই পুলিশ অফিসার গরাদের দরজা খুলে দিল। ওবায়দুল সাহেব বের হয়ে এসেই আরশের সামনে দাঁড়ালেন। তবে এবার কোনো রাগ বা অহংকার ছিল না, ছিল এক পরাজিত বাবার ব্যাকুলতা।
বাড়ি ফেরার পর ওবায়দুল সাহেবের পরিবর্তন দেখে নেহার মা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। যে মানুষটি একটু এদিক-ওদিক হলেই চিৎকার-চেঁচামেচি করতেন, তিনি আজ দরজায় দাঁড়িয়ে স্ত্রীর সামনে মাথা নিচু করে ক্ষমা চাইলেন।
"আমাকে ক্ষমা করে দাও," ওবায়দুল সাহেব চোখের জল ফেলে বললেন। "আমি কোনোদিন তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিইনি, নেহাকেও কোনোদিন ভালোবাসতে পারিনি। আজ আমি বুঝতে পারছি আমি কতটা ভুল ছিলাম।"
নেহার মা কেঁদে ফেলে স্বামীর হাত দুটো ধরলেন। দীর্ঘ তেইশ বছরের অন্ধকার শেষে তাদের সংসারে যেন ভোরের আলো ফুটল।
এদিকে আরশের বাংলোয় নেহা সারাদিন ছটফট করছিল। সে জানত না থানায় কী হয়েছে, বাবা ছাড়া পেয়েছেন কি না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই আরশের গাড়ি এসে থামল উঠোনে।
নেহা দ্রুত ড্রয়িংরুমে ছুটে গেল। আরশ ভেতরে ঢোকা মাত্রই সে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, "আরশ! কী হয়েছে? বাবা কেমন আছেন? তুমি কি..."
আরশ কোনো কথা না বলে নেহার কাছে এসে তাকে পরম ভালোবাসায় নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। নেহা চমকে উঠলেও আরশের শক্ত বুকে কান পেতে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল।
"তোমার বাবা এখন বাড়িতে, সম্পূর্ণ সুরক্ষিত," আরশ নেহার মাথায় চিবুক রেখে ফিসফিস করে বলল। "তিনি তার ভুল বুঝতে পেরেছেন, নেহা। আজ থেকে তোমার মায়ের ওপর আর কোনো অত্যাচার হবে না। তোমার পরিবারে আর কোনো শিকল নেই।"
নেহার চোখের কোণ দিয়ে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল। সে আরশের কোমর পেঁচিয়ে ধরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যে মানুষকে সে অত্যাচারী মনে করত, সেই মানুষটিই তার পুরো পরিবারকে এক নতুন জীবন এনে দিল!
"তুমি... তুমি এত ভালো কেন?" নেহা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল।
আরশ হালকা হেসে নেহাকে নিজের দিকে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখে ভালোবাসার এক তীব্র লালসা আর গভীরতা। "কারণ আমি এই ভীতু মেয়েটাকে আমার সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি। আর তার মুখে এই হাসিটুকুর জন্য আমি পুরো দুনিয়া ওলটপালট করে দিতে পারি।"
আরশ ধীরে ধীরে নেহাকে কোলে তুলে নিল। নেহা লজ্জায় আরশের কাঁধে মুখ লুকাল।
বেডরুমে এনে নেহাকে নরম বিছানায় শুইয়ে দিল আরশ। মোমের হালকা আলোয় নেহার সৌন্দর্য যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠেছিল। আরশ নেহার ওপর ঝুঁকে পড়ে তার গালে, কপালে আর ঠোঁটে গভীর অনুরাগে চুমু আঁকতে লাগল।
নেহা আর নিজেকে সরিয়ে নেয়নি। সে দুই হাতে আরশের গলা জড়িয়ে ধরে তার সমস্ত ভালোবাসাকে নিজের মধ্যে টেনে নিল। সব ভয়, সব শঙ্কা আজ উবে গেছে—রয়ে গেছে শুধু দুজন মানুষের আকুল প্রেম ও অনুরাগের এক উষ্ণ রাত।
কয়েকটি মাস যেন দেখতে দেখতে বসন্তের বাতাসের মতো বয়ে গেল। নেহার জীবনে এখন আর কোনো কালো মেঘের ছায়া নেই, নেই মধ্যরাতের সেই পরিচিত আতঙ্কের প্রহর। যে মেয়েটি একসময় স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস ফেলতেও ভয় পেত, সে এখন এক বিশাল সাম্রাজ্যের রানীর মতো মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখেছে। আর তার এই পরিবর্তনের কারিগর আর কেউ নয়—তার স্বামী, তার পরম আশ্রয় আরশ।
আজ নেহাদের বাড়িতে এক বিশাল উৎসবের আমেজ। ওবায়দুল সাহেব ও তার স্ত্রী আজ নিজেদের বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ মিলাদ ও নৈশভোজের আয়োজন করেছেন। বাড়ির পুরো পরিবেশটাই এখন আলোঝলমলে আর সুবাসিত।
আরশের বিলাসবহুল গাড়িটা যখন নেহাদের বাড়ির উঠোনে এসে থামল, তখন ওবায়দুল সাহেব নিজেই সামনে এগিয়ে এলেন দরজার কাছে। গাড়ি থেকে নেমে আরশ নেহার হাত ধরে সসম্মানে নামিয়ে আনল। নেহার পরনে হালকা পিয়াজি রঙের এক জাঁকজমকপূর্ণ জামদানি শাড়ি, আর আরশের পরনে তার সাথে ম্যাচিং করা পার্পল-ব্ল্যাক শেরওয়ানি। দুজনকে একসাথে ঠিক যেন এক রাজজোড়া লাগছিল।
ওবায়দুল সাহেব এগিয়ে এসে পরম মমতায় আরশের কাঁধে হাত রাখলেন। তার চোখে এখন আর সেই পুরোনো হিংস্রতা বা অহংকার নেই, সেখানে রাজত্ব করছে এক পরম স্নেহ আর ভালোবাসা।
"এসো বাবা, ভেতরে এসো," ওবায়দুল সাহেব আন্তরিক কণ্ঠে বললেন। তারপর নেহার মাথায় হাত রেখে বাৎসল্যভরা গলায় বললেন, "আমার মা কেমন আছে?"
নেহা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। "আমি খুব ভালো আছি, বাবা।"
ভেতরে ঢুকতেই নেহার মা ছুটে এলেন। তিনি নেহাকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেললেন, তবে এ জল কষ্টের নয়—এ যেন পরম তৃপ্তির আনন্দাশ্রু। নেহা লক্ষ করল, তার মায়ের চেহারায় এখন এক শান্ত সৌম্য ভাব, কোনো ভয় বা উদ্বেগের ছাপ নেই। ওবায়দুল সাহেব এখন স্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল, প্রতিদিনের সাংসারিক কাজেও তিনি হাত বাড়ান। দীর্ঘদিনের অন্ধকার পরিবারটিতে এখন শুধুই হাসিমুখ আর স্নেহের আলো।
নৈশভোজের পর সবাই যখন ড্রয়িংরুমে গল্প করছিল, আরশ চুপিচুপি নেহার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল পেছনের নির্জন বেলকনিতে। রাতের আলো-আঁধারিতে খোলা আকাশের নিচে স্নিগ্ধ বাতাস বইছিল।
নেহা আলতো করে আরশের বুকের ওপর হেলান দিল। আরশ পেছন থেকে তার দু-হাত দিয়ে নেহার কোমর জড়িয়ে ধরে থুতনিটা রাখল নেহার কাঁধে।
"কী ভাবছ, রূপসী?" আরশ নিচু আর ভারী গলায় নেহার কানে ফিসফিস করে বলল।
নেহা এক গভীর নিঃশ্বাস ফেলে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে বলল, "ভাবছি জীবনের অলৌকিক কথা। একদিন যে মানুষটাকে বাঘের মতো ভয় পেতাম, যার সামনে দাঁড়াতে গিয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যেত, আজ তার বুকেই আমি আমার সবটুকু শান্তি খুঁজে পাই।"
আরশ হালকা একটু হেসে নেহার চুলে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। "আমি কিন্তু প্রথম দিন থেকেই তোমাকে জয় করতে চেয়েছিলাম, নেহা। তোমার ওই ভীতু হরিণচোখ দুটো আমাকে প্রথম দিনেই পাগল করে দিয়েছিল। আমি জানতাম, তোমার ওই শৃঙ্খলগুলো না ভাঙলে আমি তোমাকে কোনোদিন পুরোপুরি পাব না।"
নেহা ঘুরে দাঁড়িয়ে আরশের শার্টের বোতামে হাত রেখে চোখ তুলে তাকাল। "তুমি যদি সেদিন অতটা কঠোর না হতে, হয়তো আমি কোনোদিন এই আলোর মুখ দেখতে পেতাম না। তুমি আমাকে শুধু ভালোবাসোইনি, আরশ, তুমি আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছ।"
আরশ নেহার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে তার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে এখন অনুরাগের সেই চেনা গভীর সমুদ্র।
"তুমি আমার জীবনটাকে পূর্ণ করেছ, নেহা," আরশ পরম আকুলতায় বলল। "তোমার এই সরলতা আর ভালোবাসাই আমার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পত্তি।"
আরশ ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে নেহার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলালো। এক দীর্ঘ, গভীর ও আবেশে ভরা চুমুতে সিলমোহর পড়ে গেল তাদের দীর্ঘ ভালোবাসার গল্পে।
আকাশের চাঁদের আলো তখন তাদের ওপর ঠিকরে পড়ছিল। শিকল ভাঙার সেই কঠিন যাত্রা আজ ভালোবাসার পরম পূর্ণতায় রূপ নিয়েছে—যেখানে নেই কোনো ভয়, নেই কোনো যন্ত্রণা, আছে শুধু আরশ আর নেহার এক অখণ্ড, অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার রাজত্ব।
....